• বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৫৩ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় সাবেক এমপি বদির জামিন হাসিনার গণহত্যার বর্ণনা সংসদে তুলে ধরবেন রাষ্ট্রপতি শিল্প-সাহিত্যচর্চাকে রাজনীতিকীকরণ সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয় : প্রধানমন্ত্রী জামিন পেলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী বঞ্চিত – নিপীড়িত মফস্বল সাংবাদিকরা দাউদকান্দিতে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা “ডা: মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশন”এর পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে শুভেচ্ছা হ্যাটট্রিক ভাইস চেয়ারম্যান দিলারা শিরিনকে সংরক্ষিত নারী আসনে দেখতে চায় তৃণমূল মেঘনার জমিদার বাড়ি প্রকৃত মালিকদের সমন্বয়ে প্রত্নসম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ সময়ের দাবি মেঘনায় মাদক নির্মূলে কঠোর বার্তা, জিরো টলারেন্সের ঘোষণা

বঞ্চিত – নিপীড়িত মফস্বল সাংবাদিকরা

বিপ্লব সিকদার / ২৯ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে মফস্বল সাংবাদিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবতা হলো—এই ক্ষেত্রটি আজও বঞ্চিত ও নানা মাত্রায় নিপীড়িত। রাজধানীভিত্তিক মিডিয়া কাঠামোর বাইরে থাকা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা একদিকে যেমন তথ্যের প্রাথমিক উৎস, অন্যদিকে তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার শিকার। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের যে আদর্শিক অবস্থান, তা মফস্বলে গিয়ে অনেক সময়ই ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।বাংলাদেশে সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ শুরু হয় ঔপনিবেশিক আমলে। ১৮১৮ সালে প্রকাশিত সমাচার দর্পণ ছিল বাংলার প্রথম সংবাদপত্র, যা উপনিবেশিক শাসন, সমাজ ও স্থানীয় ঘটনাবলির সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে সংবাদ প্রভাকর বা দৈনিক ইত্তেফাক-এর মতো পত্রিকাগুলো জাতীয় রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও জেলা ও মফস্বলের সংবাদ সংগ্রহে নির্ভর করতে হয়েছে স্থানীয় প্রতিনিধিদের ওপর। কিন্তু এই প্রতিনিধিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থায়ী চাকরি, বেতন কাঠামো বা আইনি সুরক্ষা পাননি—আজও সেই চিত্র খুব একটা বদলায়নি।
মফস্বল সাংবাদিকদের বড় একটি অংশ ‘স্ট্রিংগার’ বা খণ্ডকালীন সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। অনেকেই মাসিক সম্মানী পান না; বরং সংবাদ প্রকাশিত হলে সামান্য পারিশ্রমিক বা বিজ্ঞাপন সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। এতে সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে টেকসই হয় না, বরং নানা ধরনের আপসের ঝুঁকি তৈরি হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল—রাজনৈতিক নেতা, ঠিকাদার, ভূমিদস্যু বা অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা—সংবাদ প্রকাশে চাপ প্রয়োগ করেন। কখনো বিজ্ঞাপন বন্ধের হুমকি, কখনো মিথ্যা মামলা, এমনকি শারীরিক হামলাও ঘটে। জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত না হওয়ায় এসব ঘটনা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।ডিজিটাল যুগে অনলাইন পোর্টালের বিস্তার একদিকে সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে। জেলা পর্যায়ে অসংখ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল গড়ে উঠেছে, যাদের অনেকেরই নেই প্রশিক্ষিত জনবল বা ন্যূনতম নীতিমালা। ফলে পেশাদার সাংবাদিকরা যেমন চাপে পড়ছেন, তেমনি ভুয়া সাংবাদিকতার বিস্তারেও প্রকৃত মফস্বল সাংবাদিকদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে, অথচ দায় বহন করতে হচ্ছে স্থানীয় সংবাদকর্মীকেই।
আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্ট। রাজধানীতে বড় কোনো গণমাধ্যমকর্মী হুমকির মুখে পড়লে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, মানববন্ধন বা বিবৃতি পাওয়া যায়। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে একজন সাংবাদিক হামলার শিকার হলে অনেক সময় থানায় মামলা নিতেও গড়িমসি হয়। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রমও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শহরকেন্দ্রিক। ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে প্রায় একা।
তবে এই প্রতিকূলতার মাঝেও মফস্বল সাংবাদিকতার অবদান অনস্বীকার্য। স্থানীয় দুর্নীতি, নারী ও শিশু নির্যাতন, পরিবেশ ধ্বংস, ভূমি দখল কিংবা স্বাস্থ্যসেবার অনিয়ম—এসব ইস্যু প্রথমে উঠে আসে মফস্বলের প্রতিবেদনে। পরে তা জাতীয় গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ তথ্যপ্রবাহের শিকড় রয়েছে গ্রামে-গঞ্জে। এই শিকড় দুর্বল হলে পুরো গণমাধ্যম কাঠামোই ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।
অতএব, মফস্বল সাংবাদিকতার বঞ্চনা দূর করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। সংবাদদাতাদের জন্য ন্যূনতম সম্মানী কাঠামো নির্ধারণ, আইনি সহায়তা তহবিল গঠন, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং জেলা পর্যায়ে শক্তিশালী সাংবাদিক ইউনিয়ন গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গণমাধ্যম মালিকপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে। মফস্বল প্রতিনিধিদের কেবল সংবাদ সরবরাহকারী হিসেবে নয়, বরং সমান মর্যাদার পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে রাজধানীর আলো যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রান্তিক জনপদের কণ্ঠস্বরও সমানভাবে শ্রুত হওয়া জরুরি। মফস্বল সাংবাদিকতার বঞ্চনা দূর না হলে সেই কণ্ঠস্বর ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাবে, আর গণতন্ত্রের ভিতও ততটাই দুর্বল হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন