মেঘনার শিক্ষাঙ্গনে এক আবেগঘন দিন। দীর্ঘ ৩৯ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন আবুল কালাম ভূঁইয়া। তাঁর অবসর কেবল একটি চাকরিজীবনের সমাপ্তি নয়; এটি এক আলোকিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি, যার প্রতিটি পৃষ্ঠা জুড়ে আছে সততা, নৈতিকতা ও নিরলস সাধনার গল্প।২০০৯ সালের ০৯ জুলাই তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন মানিকারচর সাহেরা লতিফ মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এ। দায়িত্ব গ্রহণের পর সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, শৃঙ্খলা ও সময়নিষ্ঠতার মাধ্যমে তিনি বিদ্যালয়টিকে দ্রুত উপজেলার শীর্ষ অবস্থানে উন্নীত করেন। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই আসে দৃশ্যমান অগ্রগতি। নারী শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান মেঘনা উপজেলায় বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি বিশ্বাস করতেন—শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, শিক্ষা মানে মানুষ হয়ে ওঠার সাধনা। তাই শ্রেণিকক্ষে তিনি যেমন ছিলেন কঠোর শৃঙ্খলার প্রতীক, তেমনি শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে ছিলেন স্নেহময় অভিভাবক। সততা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের পাঠ তিনি বাস্তব জীবনাচরণে তুলে ধরেছেন। তাঁর রচিত শিক্ষা বিষয়ক কবিতাগুলোতেও প্রতিফলিত হয়েছে একজন আদর্শ শিক্ষকের অন্তর্গত দর্শন।
একাধিকবার উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়টিও অর্জন করেছে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের সম্মাননা। দুইবার বাংলাদেশ স্কাউটস মেঘনা উপজেলা শাখার কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং বর্তমানে উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকা তাঁর নৈতিক দৃঢ়তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতারই প্রমাণ।
মেঘনা উপজেলার বারহাজারী গ্রামের মরহুম কলিম উদ্দিন ভূঁইয়া (মাস্টার)-এর কনিষ্ঠ পুত্র হিসেবে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ। তাহেরপুর হাজী লাল মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় (সোনারগাঁও), মুজাফফর আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে সহকারী শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে এবং পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি যে নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে।
আজ তাঁর শেষ কর্মদিবসে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নীরব আবেগ। হয়তো নেই বাহুল্য আয়োজন, কিন্তু আছে অসংখ্য কৃতজ্ঞ হৃদয়ের প্রার্থনা। একজন শিক্ষাগুরু বিদায় নিচ্ছেন দায়িত্ব থেকে রেখে যাচ্ছেন আলোকিত প্রজন্ম, অনুপ্রেরণার অসীম দিশা এবং সততার এক উজ্জ্বল মানদণ্ড। আবুল কালাম ভূঁইয়ার অবসর মানে সমাপ্তি নয়; এটি এক নতুন সূচনা—যেখানে তাঁর বপন করা আদর্শের বীজ ভবিষ্যতের পথ দেখাবে। তাঁর জীবন ও কর্ম হয়ে থাকবে মেঘনার শিক্ষাঙ্গনের প্রেরণার চিরন্তন