মেঘনা উপজেলায় ফসলি জমির টপ সয়েল কাটার যে প্রবণতা ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, তা কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়; বরং এটি দেশের কৃষি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। উন্নয়নের নামে এই অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড বাস্তবে উন্নয়ন নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিপদের বীজ বপন।
কৃষিজমির টপ সয়েল বা উপরিভাগের মাটি হলো উৎপাদনশীলতার মূল ভিত্তি। এই স্তরেই থাকে প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান, পুষ্টি এবং অণুজীব, যা ফসল উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য। অথচ অল্প সময়ের আর্থিক লাভের আশায় এই মূল্যবান স্তর নির্বিচারে কেটে নেওয়া হচ্ছে। সড়ক নির্মাণ, বসতবাড়ি, প্লট ব্যবসা কিংবা বিভিন্ন প্রকল্পের অজুহাতে এই মাটি অপসারণ করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই কর্মকাণ্ড অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনের তোয়াক্কা না করেই পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কৃষিজমির উর্বর মাটি কাটার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। এটি প্রমাণ করে যে, আইন থাকা সত্ত্বেও কার্যকর প্রয়োগের অভাব এবং নজরদারির দুর্বলতা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।স্থানীয়ভাবে দেখা যাচ্ছে, একটি প্রভাবশালী চক্র এই মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত। তাদের রয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব, যার ফলে তারা নির্বিঘ্নে এই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে। এতে সাধারণ কৃষকরা হয়ে পড়ছেন অসহায়। তাদের জমির পাশ থেকে গভীর করে মাটি কেটে নেওয়ার ফলে জমি ধসে পড়ছে, উৎপাদন কমে যাচ্ছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে জমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। ফলে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এটি শুধু কৃষির ক্ষতিই করছে না, বরং পরিবেশের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। টপ সয়েল অপসারণের ফলে মাটির গঠন নষ্ট হয়ে যায়, জলধারণ ক্ষমতা কমে যায় এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে গিয়ে বন্যা বা জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি খাল-বিল ভরাট হয়ে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের পরিবেশগত সংকট তৈরি করতে পারে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হলেও তা সমস্যার তুলনায় অপ্রতুল। বড় সিন্ডিকেট বা মূল হোতাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাটো শ্রমিকদের শাস্তি দিয়ে মূল অপরাধীদের আড়াল করা হচ্ছে, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়ন হতে হবে পরিকল্পিত ও টেকসই। কৃষিজমি ধ্বংস করে, পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনতে পারে না। বরং তা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করে। তাই এখনই প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।এক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনের উপর নির্ভর করলেই হবে না। জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সচেতন মহল এবং সাধারণ জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং প্রয়োজন হলে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে প্রশাসনকে সক্রিয় করতে হবে।