• রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৪১ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
দেশে ভোটার ১২ কোটি ৮৬ লাখ ৩২ হাজার ৫৫৫ মেঘনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল সংস্কারের পর পানাম সেতুতে আখের বাজার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত-এনসিপির প্রার্থী দেওয়াকে স্বাগত রাশেদ খানের হোমনায় সরকারি দপ্তরের সামনে জলাবদ্ধতা, দায় নেবে কে? হোমনায় সরকারি দপ্তরের সামনে জলাবদ্ধতা, দায় নেবে কে? প্রথম শ্রেণির স্মার্ট জীবননগর পৌরসভা গঠনে মেয়র পদে পরিবর্তনের নায়ক শাহজাহান মিয়া বেক্সিমকোর মানিলন্ডারিং তদন্ত নিয়ে অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ সিআইডির জুলাই গণঅভ্যুত্থান কারো একক পৈতৃক সম্পত্তি নয়: ইশরাক হোসেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ

সংস্কারের পর পানাম সেতুতে আখের বাজার

নিজস্ব সংবাদ দাতা / ৬ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টার:

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ইতিহাসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে পানাম সেতু। ইটের গায়ে মুঘল আমলের স্থাপত্যের ছাপ, তিনটি খিলান, নিচ দিয়ে একসময় নৌযান চলাচলের ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি পুরোনো সেতু নয়, বাংলাদেশের প্রত্নঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রে সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৩ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৫ মিটার। স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের কারণে এটিকে মুঘল আমলের, অর্থাৎ সপ্তদশ শতকের স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিই এখন নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। সংস্কার শেষ হওয়ার পর যেখানে থাকার কথা ছিল পরিচ্ছন্নতা, নিয়ন্ত্রিত পর্যটনব্যবস্থা এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের নজরদারি, সেখানে সেতুর ওপরই দেখা যাচ্ছে আখ বিক্রির মতো বাণিজ্যিক কার্যক্রম। আখের ছোবড়া, ব্যবহৃত পলিথিন, ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক ও মানুষের চলাচলের চাপ—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, কোটি টাকার সংস্কার কি শেষ পর্যন্ত কয়েক মাসের মধ্যেই অব্যবস্থাপনার কাছে পরাজিত হবে?

সাম্প্রতিক সংস্কারকাজ নিয়ে সরকারি দরপত্রের তথ্যও পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় ‘Renovation and conservation work of the Panam Bridge’ নামে কাজের দরপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ সেতুটির সংরক্ষণ ও সংস্কারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—এটি স্পষ্ট।

২০২৬ সালের জুনেও সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির একটি প্রতিনিধি দল সেতুটির সংস্কারকাজ পরিদর্শন করে। স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরেই সেতুটির সংরক্ষণ ও সংস্কারের দাবি ছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এ নিয়ে মানববন্ধনও হয়েছিল। তখন আয়োজকেরা সেতুটির জরাজীর্ণ অবস্থার কথা তুলে ধরে দ্রুত সংস্কার ও পর্যটকদের জন্য উপযোগী করার দাবি জানিয়েছিলেন।

অর্থাৎ যে স্থাপনাটিকে রক্ষার জন্য নাগরিক সমাজকে রাস্তায় দাঁড়াতে হয়েছে, যে স্থাপনার সংস্কারে সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেই স্থাপনাই সংস্কারের পর আবার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ঝুঁকিতে পড়লে প্রশ্ন উঠবেই—সংরক্ষণের পরিকল্পনা কোথায়?

পানাম সেতুর সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো আখ বিক্রির দোকান নয়। সংকটটি আরও গভীরে। সমস্যা হলো ঐতিহাসিক স্থাপনাকে আমরা এখনও ‘পুরোনো স্থাপনা’ হিসেবে দেখি, ‘সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ’ হিসেবে নয়।

একটি সাধারণ রাস্তার পাশে আখের দোকান বসা এবং একটি প্রত্নস্থাপনার ওপর আখ বিক্রি—দুটি বিষয় এক নয়। কারণ প্রত্নস্থাপনার প্রতিটি অংশের ব্যবহার, পরিবেশ, দৃশ্যমানতা এবং দর্শনার্থীদের আচরণ সংরক্ষণ ব্যবস্থার অংশ। সেখানে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড অনুমোদিত বা অননুমোদিত—দুটির যেকোনো একটি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কিন্তু পানাম সেতুর ক্ষেত্রে সেই নজরদারি কতটা কার্যকর, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণে পানাম নগর বহুবার আলোচনায় এসেছে। অতীতেও পানাম নগরের সংরক্ষণকাজ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আপত্তি উঠেছিল। ২০০৭ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংরক্ষণকাজে যথাযথ ঐতিহাসিক নথি, বিশেষজ্ঞ ও স্থাপত্যবিদের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।

২০০৮ সালেও সংস্কারের পর পানাম নগরের কিছু ভবনের নকশা ও অলংকরণের স্বকীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি সংবাদে উঠে এসেছিল।

এই পুরোনো বিতর্কগুলো আজকের পানাম সেতুর ঘটনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কারণ প্রত্নঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে শুধু ভাঙা ইট জোড়া লাগানো নয়। সংরক্ষণ মানে ঐতিহাসিক স্থাপনার চরিত্র, পরিবেশ, দৃশ্যমানতা এবং ব্যবহারিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা।

একটি সেতুর সংস্কার করে সেটিকে আবার বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের চাপে ফেলে দেওয়া হলে সেটি প্রকৃত অর্থে সংরক্ষণ নয়; বরং ক্ষয়কে কিছুটা সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়া।

এখানে স্থানীয় প্রশাসনেরও প্রশ্নের মুখে পড়ার কারণ রয়েছে। কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনার আশপাশে অস্থায়ী দোকান বসলে সেটি কার অনুমতিতে বসছে? ব্যবসায়ীরা কোথা থেকে জায়গা পাচ্ছেন? প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্থানীয় কার্যালয় কি বিষয়টি জানে? জানলে কী ব্যবস্থা নিয়েছে? আর না জানলে নিয়মিত তদারকির দায়িত্বটি কোথায়?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রকাশ্যে আসা দরকার।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। আখ বিক্রি নিজে কোনো অপরাধ নয়। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জীবিকার জন্য আখ বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে গিয়ে যদি জাতীয় ঐতিহ্যের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে দায় শুধু বিক্রেতার নয়; ব্যবস্থাপনারও।

প্রশ্ন তাই আখওয়ালাকে সরিয়ে দেওয়ার চেয়ে বড়—কেন তাকে ঐতিহাসিক সেতুর ওপর বসার সুযোগ তৈরি হলো?

একজন বিক্রেতাকে সরিয়ে দিলে হয়তো আজকের দৃশ্য বদলাবে। কিন্তু আগামীকাল আবার অন্য কেউ বসবে। তারপর আসবে চা, ফুচকা, ঝালমুড়ি, ভ্রাম্যমাণ দোকান কিংবা অন্য কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম। একসময় দর্শনার্থীর চেয়ে দোকানের সংখ্যা বেশি হয়ে যেতে পারে। তখন পানাম সেতু থাকবে ঠিকই, কিন্তু তার ঐতিহাসিক আবহ হারিয়ে যাবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।

আখ বিক্রির পর ছোবড়া কোথায় যাচ্ছে? পলিথিন ও প্লাস্টিক কে পরিষ্কার করছে? প্রতিদিন কতবার জায়গাটি পরিষ্কার করা হচ্ছে? বৃষ্টির সময় এসব বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে? সেতুর নিচের খাল বা জলপ্রবাহের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

কারণ প্রত্নস্থাপনার ক্ষয় সবসময় চোখে দেখা ফাটল দিয়ে শুরু হয় না। কখনো শুরু হয় পরিবেশগত অব্যবস্থাপনা দিয়ে, কখনো মানুষের অতিরিক্ত চাপ দিয়ে, কখনো অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসা দিয়ে।

সরকারি অর্থে সংস্কারের পর একটি স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা না থাকলে সেই ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। একবার সংস্কার করে কয়েক বছর অপেক্ষা করে আবার সংস্কার—এটি কোনো টেকসই সংরক্ষণ নীতি হতে পারে না।

পানাম সেতুকে ঘিরে তাই প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। সেতুর ওপর ও সংরক্ষিত এলাকায় সব ধরনের অননুমোদিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রয়োজনে নির্দিষ্ট বিকল্প জায়গা তৈরি করা যেতে পারে। সেতুর প্রবেশপথে বর্জ্য ফেলার নিষেধাজ্ঞা, নির্দিষ্ট ডাস্টবিন, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা এবং সিসিটিভি নজরদারি চালু করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে সেতুটির সামনে দৃশ্যমান তথ্যফলক স্থাপন করা দরকার। সেখানে এর নির্মাণকাল, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং সংরক্ষণ বিধি তুলে ধরা যেতে পারে। দর্শনার্থীরা জানবেন, তাঁরা কোনো সাধারণ সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নেই; তাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের সামনে।

সরকারি নথিতে পানাম নগর এলাকার সঙ্গে পানাম, দালালপুর ও পানামনগর—এই তিনটি ইটের সেতুর ঐতিহাসিক সম্পর্কের উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ পানাম সেতু কোনো বিচ্ছিন্ন স্থাপনা নয়; এটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক নগর-পরিবেশের অংশ।

সুতরাং একটি সেতু সংস্কার করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। পুরো ঐতিহাসিক পরিবেশকে সংরক্ষণ করতে হয়।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—আমরা যখন বুঝব স্থাপনাটি আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তখন হয়তো আর কিছু করার থাকবে না। কারণ ইতিহাসের ক্ষতি হিসাব করা যায় না শুধু টাকার অঙ্কে।

আজ আখের ছোবড়া সরিয়ে ফেলা সম্ভব। কাল নতুন করে দোকান বসানো বন্ধ করা সম্ভব। আজই প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে সংরক্ষিত এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার স্বকীয়তা একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা কোটি টাকা খরচ করেও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন।

তাই পানাম সেতু নিয়ে এখনই প্রশ্ন তোলা জরুরি—সংস্কারের পর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার? নজরদারি কার? বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার? দোকান বসানোর অনুমতি কে দিয়েছে? আর যদি কোনো অনুমতি না থাকে, তাহলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন এতদিন কী করেছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাওয়া মানে কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়। বরং একটি জাতীয় ঐতিহ্যের পক্ষে দাঁড়ানো।

পানাম সেতু কোনো বাজার নয়। এটি ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল। এখানে আখ বিক্রি হতে পারে—কিন্তু ইতিহাস বিক্রি হওয়ার সুযোগ দেওয়া যায় না।

সংস্কারের নামে কোটি টাকা ব্যয় করে যদি আবার অবহেলায় সেতুটি ময়লা, দখল ও অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যের কবলে পড়ে, তাহলে দায় শুধু আজকের আখ বিক্রেতার নয়; দায় হবে আমাদের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার।

এখনও সময় আছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে মাঠে নামতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। দর্শনার্থীদের সচেতন করতে হবে। আর নাগরিকদেরও বুঝতে হবে—ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়।

নইলে একদিন হয়তো পানাম সেতু থাকবে, সংস্কারের ইটও থাকবে, সরকারি ব্যয়ের হিসাবও থাকবে—শুধু থাকবে না সেই ঐতিহাসিক সৌন্দর্য, যার জন্য এত আয়োজন।

তখন প্রশ্ন উঠবে—আমরা কি ইতিহাস সংরক্ষণ করেছিলাম, নাকি শুধু তার ধ্বংসকে আরও কিছুদিন পিছিয়ে দিয়েছিলাম?


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন