দাউদকান্দির গোমতী নদীর তীরে আধুনিক নৌবন্দর স্থাপনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু দাউদকান্দি নয়, নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। নদী, চর, যোগাযোগ ও শিল্পায়নকে ঘিরে তৈরি হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক বলয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একটি প্রতিনিধি দল দাউদকান্দির গোমতী নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে। সম্ভাব্য নৌবন্দর স্থাপনের জন্য নদীর নাব্যতা, তীরবর্তী অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও সম্ভাব্য স্থানগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। প্রতিনিধি দলের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এটি কেবল একটি নৌবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দাউদকান্দি, তিতাস ও মেঘনার বিস্তীর্ণ এলাকার ভবিষ্যৎ। কাঠালিয়া ও গোমতী নদীবেষ্টিত চেংগাকান্দি, ভাটেরা, গংগাপ্রশাদ, দুধঘাটা, নন্দীর চর, বাহের চর বাজরা, চর বিনোদপুর, চর ভাটেরাসহ আশপাশের চরাঞ্চল এই প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফলভোগী হতে পারে।
নৌবন্দর হলে নদীপথে পণ্য পরিবহন সহজ হবে। গড়ে উঠতে পারে গুদাম, মোকাম, পরিবহনকেন্দ্র ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কৃষিপণ্য ও স্থানীয় উৎপাদন দ্রুত বাজারজাত করার সুযোগ বাড়বে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বাড়বে ছোট-বড় ব্যবসা ও বিনিয়োগ। একই সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হবে।
বিশেষ করে মেঘনা ও দাউদকান্দি উপজেলার মধ্যে সংযোগ সড়ক ও সেতু নির্মিত হলে এই পরিবর্তনের গতি আরও বাড়তে পারে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হলে দুই উপজেলার মানুষ সরাসরি এর সুফল পাবেন। তিতাস উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকাও এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।
কিন্তু উন্নয়নের সম্ভাবনার সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। কোনো এলাকায় হঠাৎ উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হলে সেখানে জমির মূল্য বাড়ে, বিনিয়োগ বাড়ে এবং নানা স্বার্থের মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলে, এসব পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ অনেক সময় প্রকৃত সুবিধাভোগী হওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের হাতিয়ার হয়ে পড়েন।
স্বার্থান্বেষী মহল কখনো অধিকার আদায়ের কথা বলে, কখনো জমি ও বসতির নিরাপত্তার কথা বলে, আবার কখনো স্থানীয় নেতৃত্বের নামে মানুষকে বিভক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। এর সুযোগ নিয়ে চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার কিংবা সংঘাতের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে উন্নয়নের সম্ভাবনাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
চরের সাধারণ মানুষের অভিযোগ, কথিত মাতব্বরদের একাংশ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় নানা কৌশলে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করেন। কেউ একদিকে জনগণের পাশে থাকার কথা বলেন, অন্যদিকে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায়ের পথ তৈরি করেন। মাটি ও বসতির অস্তিত্ব রক্ষার নামে চাঁদা তোলার সংস্কৃতিও কোনো কোনো এলাকায় নতুন নয়। ফলে উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অপসংস্কৃতি বন্ধ করাও জরুরি।
কারণ উন্নয়ন কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। নদীবন্দর হলে এর সুবিধা পেতে হবে নদীতীরের সাধারণ মানুষকেও। জমি, বসতি, ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নদীবন্দর ঘিরে জমি দখল, চাঁদাবাজি, সংঘাত কিংবা প্রভাবশালীদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের সুযোগ যেন তৈরি না হয়, সেদিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। সম্ভাব্য নদীবন্দর এলাকার ভূমি, খাসজমি, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি, বসতি ও যোগাযোগব্যবস্থার একটি স্বচ্ছ চিত্র তৈরি করা যেতে পারে। উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে কারও জমি বা বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনগণের মতামতও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অধিকার আদায়ের নামে সংঘাত নয়, আইনের আশ্রয় নেওয়া। কোনো বিরোধ তৈরি হলে তা প্রশাসন ও আদালতের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। অপরাধ হলে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পক্ষের চাঁদাবাজি, দখলদারি কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে সামাজিকভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষই।
গোমতী ও কাঠালিয়া নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষের জীবন দীর্ঘদিন ধরেই নদী ও প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে চলেছে। সেখানে একটি আধুনিক নৌবন্দর হলে সেই জীবন ও জীবিকার গতিপথ বদলে যেতে পারে। নদীপথের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ যুক্ত হলে এ অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে নতুন বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
তবে সেই পরিবর্তন যেন কেবল প্রভাবশালী ও সুবিধাবাদীদের জন্য না হয়। উন্নয়নের সুফল যেন চরাঞ্চলের কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, নৌযানশ্রমিক ও সাধারণ পরিবারগুলোর ঘরে পৌঁছে—এটাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
গোমতী নদীর তীরে নৌবন্দর প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তাই শুধু একটি অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়; এটি একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা। এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ, স্বচ্ছতা, আইনশৃঙ্খলা ও জনগণের অংশগ্রহণ।
উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে স্থানীয় মানুষের ঐক্য। বিভেদ, সংঘাত ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি নয়—আইনের শাসন, সম্প্রীতি ও সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে। গোমতীর তীরে যদি সত্যিই আধুনিক নৌবন্দর গড়ে ওঠে, তবে সেটি যেন নদীবেষ্টিত মানুষের নতুন ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেয়—এ প্রত্যাশাই এখন দাউদকান্দি, মেঘনা ও তিতাসের মানুষের।