বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরশক্তি খাতে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরশক্তি উন্নয়নের এখনই উপযুক্ত সময়। এর মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঙ্গে বৈঠক করেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ও চীন-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন।
ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ব্যাপক জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিকল্প উৎসের উন্নয়নে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরশক্তির ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা বাংলাদেশের কাজে লাগানো যেতে পারে।
চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের জন্য এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরশক্তি উন্নয়নের উপযুক্ত সময়।’ তিনি বলেন, সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সহযোগিতার অনেক সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে চীন তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান ইয়াও ওয়েন। তাঁর ভাষ্য, দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রে বর্তমানে একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের পর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশ যৌথ ইশতেহারের মাধ্যমে নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের আওতায় অর্থনৈতিক, জ্বালানি, অবকাঠামো, শিক্ষা ও জনসম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইয়াও ওয়েন জানান, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর গত দুই মাসে দুই দেশের বিভিন্ন যৌথ প্রকল্পে অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে চীন-বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্মাণকাজের উদ্বোধন হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পাশাপাশি শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া মোংলা বন্দর প্রকল্পের কাজও এগিয়ে চলছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরকে ঘিরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগে চীনের সহযোগিতা রয়েছে। বন্দরটির উন্নয়ন দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তিস্তা নদী প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়েও বাংলাদেশের সঙ্গে চীন কাজ করছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এ প্রকল্প নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইসহ বিভিন্ন কারিগরি বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
চীনা রাষ্ট্রদূত আরও জানান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা এগিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল নির্মাণ এবং এক হাজার শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের প্রকল্পও এগিয়ে চলছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইয়াও ওয়েন বলেন, চীন শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যেই সম্পর্ক সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ যত বাড়বে, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তত বেশি শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের বর্তমান পরিস্থিতিতে চীনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতার আগ্রহকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সৌরশক্তি ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎসের ব্যবহার বাড়াতে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা পাওয়া গেলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হতে পারে।