• বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১০:০৪ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
কক্সবাজারে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আলোচনা ও দোয়া মাহফিল রাজশাহীতে পৃথক অভিযানে নারীসহ ১১ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার কালাইয়ে দখলদারির জেরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১০ ফুটের রাস্তা এখন সাড়ে ৪ ফুট জয়পুরহাটে আখক্ষেত থেকে মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার জয়পুরহাটে যুবকদের স্বাবলম্বী করতে প্রশিক্ষণ হাসপাতালে রোগী অপেক্ষায়, পাশের ডায়াগনস্টিকে চিকিৎসক পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বাকেরগঞ্জে আনন্দ র‍্যালি দুর্ঘটনায় আহত বখতিয়ারের পাশে নোবিপ্রবি, সফল অস্ত্রোপচার ক্যাম্পাস বিনির্মাণে নোবিপ্রবিতে ছাত্রদলের শিক্ষার্থীবান্ধব ৬ প্রস্তাব টেকনাফের দুই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গণহত্যা দিবস পালিত

সুযোগ-সুবিধার সংকট, নজরদারির অভাব ও সামাজিক অবক্ষয়ে ঝুঁকির মুখে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

বিপ্লব সিকদার / ২৪৩ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদ একসময় ছিল নির্মল শৈশবের প্রতীক। সবুজ মাঠ, নদী-খাল, পাখির ডাক, বিকেলের খেলাধুলা আর পারিবারিক বন্ধনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠত শিশু-কিশোররা। কিন্তু গত এক দশকে গ্রামীণ সমাজের দৃশ্যপট দ্রুত বদলে গেছে। প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন, অর্থনৈতিক চাপ, সাংস্কৃতিক চর্চার সংকোচন এবং পারিবারিক নজরদারির দুর্বলতায় গ্রামের শিশু-কিশোরদের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক বিচ্যুতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
শিশু অধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামীণ অঞ্চলে শিশু-কিশোরদের সুষম বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। অনেক এলাকায় খেলার মাঠ নেই, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নেই, এমনকি নিয়মিত অভিভাবকীয় তদারকিও নেই। ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে মোবাইল আসক্তি, কিশোর গ্যাং, মাদকসেবন ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে আগামী এক দশকের মধ্যে এর ভয়াবহ সামাজিক প্রভাব দৃশ্যমান হতে পারে।
হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ, বন্দি হচ্ছে শৈশব
কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রামীণ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শিশুদের খেলার মাঠ দিন দিন কমে যাচ্ছে। কোথাও মাঠ দখল হয়েছে বাজারে, কোথাও গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প, আবার কোথাও সরকারি জমি বেহাত হয়ে গেছে।
একসময় যে মাঠে প্রতিদিন বিকেলে ফুটবল, ক্রিকেট, হাডুডু বা গোল্লাছুট খেলা হতো, এখন সেখানে দেখা যায় দোকানপাট কিংবা নির্মাণকাজ।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, খেলার মাঠ শুধু বিনোদনের স্থান নয়; এটি শিশুদের সামাজিকীকরণ, নেতৃত্বগুণ, শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক বিকাশের অন্যতম মাধ্যম। মাঠ হারিয়ে যাওয়ার ফলে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মোবাইল ফোন হয়ে উঠছে নতুন অভিভাবক
গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের সামনে—সবখানেই এখন শিশু-কিশোরদের হাতে স্মার্টফোন দেখা যায়। অনলাইন গেম, ভিডিও কনটেন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছে তারা।
অনেক অভিভাবক ব্যস্ততার কারণে সন্তানকে সময় দিতে না পেরে মোবাইল ফোনকেই বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে দিচ্ছেন। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
শিক্ষকরা বলছেন, আগে বিদ্যালয় শেষে শিক্ষার্থীরা মাঠে যেত, বন্ধুদের সঙ্গে মিশত। এখন অনেকেই ঘরে বসে ভার্চুয়াল জগতে ডুবে থাকে। ফলে তাদের সামাজিক দক্ষতা ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা কমে যাচ্ছে।
বিদেশে বাবা, ব্যস্ত মা—নজরদারিহীন বেড়ে ওঠা
গ্রামীণ বাংলাদেশের বহু পরিবারে বাবা কর্মসূত্রে বিদেশে থাকেন। অন্যদিকে মা সংসার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকেন। ফলে সন্তানদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মেলামেশা কিংবা অনলাইন কার্যক্রমের ওপর পর্যাপ্ত নজরদারি থাকে না।
কিশোর অপরাধ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিবার থেকে মানসিক বিচ্ছিন্নতা অনেক ক্ষেত্রে একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের শুধু খাবার, পোশাক বা শিক্ষা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের মানসিক অবস্থা বোঝা, কথা শোনা এবং সময় দেওয়া সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যালয় আছে, কিন্তু নেই সৃজনশীল বিকাশের পরিবেশ
গ্রামের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিজ্ঞানচর্চা, বিতর্ক বা নেতৃত্ব বিকাশের কার্যক্রম তুলনামূলক কম।
ফলে শিক্ষার্থীরা বইয়ের বাইরে জীবন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, কেবল পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর সফলতা নির্ধারণ করা যায় না। একজন শিশু যখন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করে, তখনই তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার
একসময় কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা মূলত শহরকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু এখন এর প্রভাব গ্রামীণ এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক এলাকায় কিছু কিশোর দলবদ্ধভাবে আধিপত্য বিস্তার, মারামারি, চাঁদাবাজি কিংবা সামাজিক বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবসর সময়ের অপব্যবহার, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, নেতিবাচক বন্ধুত্ব এবং পারিবারিক অবহেলা কিশোর গ্যাং গঠনের অন্যতম কারণ।
মাদক পৌঁছে গেছে গ্রামে
মাদক ব্যবসায়ীরা এখন শুধু শহর নয়, গ্রামের তরুণ ও কিশোরদেরও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য সহজলভ্য হয়ে পড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। প্রথমে কৌতূহলবশত শুরু হলেও পরে অনেকেই আসক্ত হয়ে পড়ছে।
মাদকাসক্তি শুধু একজন শিশুর জীবন নয়, পুরো পরিবারের শান্তি ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সাংস্কৃতিক শূন্যতা বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
গ্রামীণ সমাজে একসময় নিয়মিত নাটক, আবৃত্তি, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বইমেলা এবং সামাজিক অনুষ্ঠান হতো। এসব আয়োজন শিশু-কিশোরদের ইতিবাচক কাজে যুক্ত রাখত।
বর্তমানে অনেক এলাকায় এসব কার্যক্রম প্রায় বিলুপ্ত।
সাংস্কৃতিক সংগঠকদের মতে, সাংস্কৃতিক চর্চা মানুষকে মানবিক করে, সহনশীলতা শেখায় এবং অপরাধপ্রবণতা কমাতে সহায়তা করে।
শিশুদের অধিকার কতটা নিশ্চিত?
বাংলাদেশে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং বিকাশের অধিকার আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গ্রামের বহু শিশু এখনো মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ বিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, অনেক এলাকায় শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার স্থান নেই, আবার কোথাও নেই পাঠাগার বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
ফলে তাদের বিকাশের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের প্রভাব
স্থানীয় সমাজে পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি, রাজনৈতিক বিভাজন, সহিংসতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রভাবও শিশু-কিশোরদের ওপর পড়ছে।
শিশুরা পরিবার, সমাজ এবং পরিবেশ থেকে যা দেখে, তার অনেক কিছুই অনুকরণ করে। তাই সমাজের নেতিবাচক চর্চা তাদের আচরণেও প্রতিফলিত হয়।
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন—
প্রতিটি ইউনিয়নে শিশু ও কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন।
খেলার মাঠ সংরক্ষণে কঠোর নীতি গ্রহণ।
বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করা।
ইউনিয়ন পর্যায়ে পাঠাগার ও বিজ্ঞান ক্লাব প্রতিষ্ঠা।
কিশোরদের জন্য কাউন্সেলিং সেবা চালু করা।
অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি।
মাদক ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
স্থানীয় সরকার, প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা।
একটি প্রজন্মকে রক্ষার লড়াই
শিশু-কিশোররা কোনো দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আজ যারা গ্রামের মেঠোপথে হাঁটছে, বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কিংবা স্বপ্ন দেখছে, তারাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে।
তাদের যদি অবহেলা, বৈষম্য, মাদক, সহিংসতা ও সুযোগের অভাবের মধ্যে বড় হতে হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতি। আর যদি তারা সঠিক শিক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে বেড়ে ওঠে, তবে তারাই হবে উন্নত বাংলাদেশের চালিকাশক্তি।
তাই গ্রামীণ শিশু-কিশোরদের সুরক্ষা, অধিকার ও বিকাশ নিশ্চিত করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন।
কারণ একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি স্বপ্নের মৃত্যু নয়, বরং একটি জাতির সম্ভাবনার অপচয়। আর একটি প্রজন্ম বিপথগামী হলে তার মূল্য দিতে হয় পুরো দেশকে।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন