• বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৫১ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
৫ আগস্টের বিজয়—গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক ৫ আগস্টের বিজয়—গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক মেঘনায় গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াতের গণমিছিল-সমাবেশ বাকেরগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা, আলোচনা সভা উখিয়ায় জামায়াতের উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে জয়পুরহাটে ১১ দলের গণমিছিল ও সমাবেশ ৫ আগস্ট উপলক্ষে কাইচাইল ইউনিয়ন বিএনপির বিজয় মিছিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত শ্রদ্ধা, স্মরণ ও অঙ্গীকারে নোবিপ্রবিতে পালিত হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে ত্রিশালে আহত যোদ্ধা ও নিহত পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা মেঘনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় গণঅভ্যুত্থান দিবস পালিত

ট্রাক্টরের পেছনে ছুটে চলা শৈশব

নিজস্ব সংবাদ দাতা / ১৬ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

এম. এ. এইচ. রাকিবুল ইসলাম:

বর্ষা এলেই গ্রামের চেহারা বদলে যেত। মাঠের পর মাঠ পানিতে ডুবে থাকত। কোথাও থইথই পানি, কোথাও হাঁটুজল, আবার কোথাও কাদামাটির গভীর আস্তরণ। চারদিকে এক অদ্ভুত সজীবতা। সেই বর্ষার মাঠে আমন ধান রোপণের আগে ট্রাক্টর নামলেই শুরু হতো আমাদের শৈশবের সবচেয়ে আনন্দময় আয়োজনগুলোর একটি—মাছ ধরা।

ট্রাক্টরের লাঙল মাটির বুক চিরে এগিয়ে যেত। কাদামাটি উল্টে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসত ছোট ছোট দেশি মাছ। আর মাছ দেখা মাত্রই আমরা ছুটে যেতাম। কারও হাতে ঝাঁকি, কারও হাতে বালতি, কারও হাতে গামলা কিংবা সবজি ধোয়ার চালনি; আবার কেউ খালি হাতেই কাদায় নেমে পড়ত।

ট্রাক্টরের পেছনে ছুটতে ছুটতে কখন যে জামাকাপড় কাদায় মাখামাখি হয়ে যেত, সেদিকে আমাদের কোনো খেয়ালই থাকত না। চোখজুড়ে তখন শুধু মাছ আর মাছ। একটা কৈ কিংবা পুঁটি হাতে উঠলেই মনে হতো, যেন বিশাল কোনো সাফল্য অর্জন করেছি। আর একটু বড় কোনো মাছ পেলে তো আনন্দে বন্ধুরা মিলে হইচই পড়ে যেত।

আজ বহু বছর পরও এমন দৃশ্য চোখে পড়লে আমি আর বর্তমানের মানুষটি হয়ে থাকতে পারি না। হঠাৎ করেই কোথায় যেন হারিয়ে যাই। ফিরে যাই সেই কাদামাখা দিনগুলোতে—যে দিনগুলোতে আনন্দের জন্য কোনো দামি খেলনা, স্মার্টফোন কিংবা বিনোদনের বিশেষ কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হতো না।

একটি বর্ষার মাঠই ছিল আমাদের খেলার মাঠ। কাদামাটিই ছিল আমাদের আনন্দের উপকরণ। আর ট্রাক্টরের পেছনে ছুটে মাছ ধরাই ছিল আমাদের কাছে এক ধরনের উৎসব।

আজকাল যখন দেখি কোনো মাঠে ট্রাক্টর চলছে, আর তার পেছনে একদল শিশু-কিশোর মাছ ধরতে ছুটছে, তখন তাদের মধ্যে নিজের ছায়াটাই দেখতে পাই। মনে হয়, ওই ছেলেটির জায়গায় যদি আবার একবার দাঁড়াতে পারতাম! হাতে যদি আবার একটি পুরোনো বালতি থাকত, আর পাশে যদি থাকত সেই শৈশবের বন্ধুরা!

কিন্তু সময় কাউকে দ্বিতীয়বার শৈশব দেয় না।

শৈশবের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই—তখন আমরা জানতাম না, আমরা সুখী। বুঝতাম না, ওই কাদামাখা বিকেলগুলোই একদিন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে উঠবে। তখন মাছের সংখ্যা দিয়ে আনন্দ মাপতাম, আজ স্মৃতির গভীরতা দিয়ে সেই আনন্দকে খুঁজি।

তখন বাড়ি ফিরলে মায়ের বকুনি জুটত। কাপড় নষ্ট করেছি, শরীর কাদায় মাখিয়েছি। কিন্তু সেই বকুনির মধ্যেও ছিল এক ধরনের মায়া। হাতে ধরা কয়েকটি মাছ দেখিয়ে যখন বলতাম, “দেখো, আজ এত মাছ পেয়েছি”, তখন হয়তো মায়ের মুখেও ফুটে উঠত হাসি। সেই হাসির মূল্য তখন বুঝিনি।

এখন বুঝি।

এখনকার শিশুরা হয়তো আমাদের মতো করে শৈশব কাটায় না। তাদের হাতে আছে স্মার্টফোন, চোখের সামনে আছে নানা ধরনের ভার্চুয়াল বিনোদন। গ্রামের মাঠেও আগের মতো শিশুদের আনাগোনা দেখা যায় না। দেশি মাছের সংখ্যাও কমেছে। জলাশয়, খাল-বিল আর মাঠের সেই চেনা পরিবেশও অনেক জায়গায় বদলে গেছে।

তবুও কোথাও যখন দেখি ট্রাক্টরের পেছনে ছুটছে একদল শিশু, কাদায় মাখামাখি হয়ে মাছ ধরছে, তখন মনে হয়, আমাদের শৈশব পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ওই শিশুদের হাসির মধ্যে যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া হাসিটাই শুনতে পাই। তাদের কাদামাখা পায়ের ছাপের মধ্যে খুঁজে পাই নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর চিহ্ন।

কখনো কখনো খুব ইচ্ছে করে আবার সেই মাঠে ফিরে যেতে। আবার কাদায় পা ডুবিয়ে দাঁড়াতে। আবার ট্রাক্টরের পেছনে ছুটতে। আবার বন্ধুর সঙ্গে মাছ ধরার প্রতিযোগিতায় নামতে। আবার বাড়ি ফিরে মায়ের সামনে বালতিভর্তি মাছ রেখে বিজয়ের হাসি হাসতে।

কিন্তু জীবন সামনে এগিয়ে যায়। মানুষ বড় হয়। শৈশব পিছনে পড়ে থাকে। মাঠ বদলে যায়, সময় বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়—শুধু কিছু স্মৃতি থেকে যায় আগের মতোই।

বর্ষার বিকেলে ট্রাক্টরের শব্দ, কাদামাটির গন্ধ আর মাছ ধরতে ছুটে চলা শিশুদের দৃশ্য আমার কাছে তাই নিছক কোনো গ্রামীণ দৃশ্য নয়। এটি যেন আমার শৈশবের দরজা খুলে দেওয়ার একটি চাবি।

সেই দরজা খুললেই আমি আবার দেখতে পাই—একদল কাদামাখা শিশু, হাতে বালতি-গামলা, চোখেমুখে উচ্ছ্বাস; সামনে চলছে ট্রাক্টর, আর আমরা সবাই তার পেছনে ছুটছি।

মাছ ধরতে নয়, আসলে তখন আমরা ছুটছিলাম আনন্দের পেছনে।

আর আজ, এত বছর পর, সেই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, আমি এখনো সেই আনন্দের পেছনেই ছুটছি।

শুধু পার্থক্য একটাই—তখন ছুটতাম মাঠের কাদার মধ্যে, আর এখন ছুটে বেড়াই স্মৃতির ভেতর।

— এম. এ. এইচ. রাকিবুল ইসলাম
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

ন্দুবাংলা টিভি. কম, ডেস্ক রিপোর্টঃ


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন