• মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৪৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
ত্রিশালে পরিত্যক্ত পুকুর থেকে বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার, শরীরে আঘাতের চিহ্ন নোবিপ্রবিতে ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষ, ভাঙচুর-ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চালকের আসনে নারী, সফলতায় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে চালক নিহত, মরদেহ মহাসড়কে রেখে অবরোধ ঢাকায় পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনে আসছে ২০০ ইভি বাস, নারীদের জন্য ১০০ বাস অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাবে সরকার, প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হবে: প্রধানমন্ত্রী মহাসড়কে এআই অটো ফাইনে বাড়বে ট্রাফিক শৃঙ্খলা কৃষি জমি ভরাট করা মেঘনাবাসীর বাণিজ্য, লাভের ভাগ যায় শর্ষের গোলায়ও গভীর রাতে নোবিপ্রবি ছাত্রদলের দু’গ্রুপে সংঘর্ষ, আহত ৩; হেনস্তার শিকার দুই সাংবাদিক নদীতে ঝোপ দেওয়া মেঘনাবাসীর ঐতিহ্য

চালকের আসনে নারী, সফলতায় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি

নিজস্ব সংবাদ দাতা / ৯ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টার:

এক হাতে স্টিয়ারিং, সামনে ব্যস্ত নগরীর সড়ক। চোখে আত্মবিশ্বাস, মনে দায়িত্ববোধ। এতদিন যে আসনটিকে অনেকেই শুধু পুরুষের কর্মক্ষেত্র হিসেবে দেখে অভ্যস্ত ছিলেন, সেই চালকের আসনেই এখন দৃঢ়ভাবে বসছেন নারীরা। এই পরিবর্তন কেবল একটি বাস চালানোর গল্প নয়; এটি বদলে যাওয়া বাংলাদেশের একটি প্রতিচ্ছবি।

নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবস্থায় নারীদের কর্মসংস্থান ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) চালু করেছে বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’, পরিচিতি পেয়েছে ‘পিংক বাস’ হিসেবে। ১৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁওয়ে এ সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় ১৩টি রুটে ১৪টি বাস দিয়ে সেবা শুরু হয়েছে। এসব বাসের চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা।

এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক—নারীর সক্ষমতার প্রতি রাষ্ট্রীয় আস্থার একটি দৃশ্যমান প্রকাশ। একজন নারী শুধু যাত্রী নন, তিনি চালকও হতে পারেন, পরিবহনকর্মীও হতে পারেন, দায়িত্বশীল পেশাজীবীও হতে পারেন—পিংক বাস সেই বার্তাটিই জনপরিসরে স্পষ্ট করে তুলেছে।

নিরাপদ যাতায়াত, বাড়বে স্বস্তি

কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী কিংবা বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রতিদিন অসংখ্য নারীকে গণপরিবহনে চলাচল করতে হয়। ভিড়, হয়রানি, অনিরাপত্তা কিংবা অস্বস্তির কারণে অনেক নারীকে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ নারী বাস সার্ভিস সেই বাস্তবতায় একটি বিকল্প ও স্বস্তিদায়ক পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।

পিংক বাসে নারী যাত্রীদের পাশাপাশি চালক ও কন্ডাক্টরও নারী হওয়ায় অনেক নারী যাত্রী গণপরিবহন ব্যবহারে বাড়তি আত্মবিশ্বাস পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বাসগুলোতে সিসি ক্যামেরা, ই-টিকিটিং ও আইটিএস সুবিধা যুক্ত করার কথাও জানানো হয়েছে।

চালকের আসনে নারী—বদলাবে সামাজিক ধারণা

আমাদের সমাজে এখনো কিছু পেশাকে নারী-পুরুষের বিভাজনে দেখার প্রবণতা রয়েছে। বাস চালানো তার একটি উদাহরণ। অথচ দক্ষতা, দায়িত্ববোধ ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে কোনো পেশার লিঙ্গগত সম্পর্ক নেই।

একজন প্রশিক্ষিত নারী যেমন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, পাইলট কিংবা উদ্যোক্তা হতে পারেন, তেমনি দক্ষ বাসচালকও হতে পারেন। চালকের আসনে নারীর উপস্থিতি তাই শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগ নয়—এটি সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তনেরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

এখানেই প্রয়োজন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। নারী চালককে সন্দেহের চোখে দেখা, তার সামান্য ভুলকে বড় করে উপস্থাপন করা কিংবা ‘নারী বলে পারবে না’—এমন ধারণা তৈরি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বরং প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতেই একজন চালককে মূল্যায়ন করা উচিত।

কর্মসংস্থানের নতুন দরজা

পিংক বাস সার্ভিস নারীদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্রের সুযোগ তৈরি করেছে। শুধু চালক নয়, কন্ডাক্টরসহ গণপরিবহনের বিভিন্ন দায়িত্বে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। এতে নারীর আয়, আত্মনির্ভরশীলতা ও পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

নারীর নিজস্ব আয় শুধু একটি পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থাই বদলায় না; এর প্রভাব পড়ে সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও। ফলে নারী কর্মসংস্থানের প্রতিটি নতুন ক্ষেত্রের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক গভীর।

মেয়েদের জন্য নতুন অনুপ্রেরণা

একজন নারী যখন বাসের চালকের আসনে বসেন, তখন শুধু তিনি নিজেই কর্মজীবনে এগিয়ে যান না—তার দৃশ্যমান উপস্থিতি অন্য অনেক মেয়েকেও স্বপ্ন দেখতে শেখায়।

একজন স্কুলছাত্রী হয়তো পিংক বাসের চালককে দেখে ভাববে, ‘আমিও বড় হয়ে এই পেশায় আসতে পারি।’ এই মানসিক পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে।

নারীর সামনে পেশার দরজা যত বেশি খুলবে, সমাজে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তত বাড়বে। আর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারী পরিবার ও সমাজে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবেন।

শুধু পিংক রং নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সাফল্য

তবে একটি বিশেষ বাস সার্ভিস চালু করলেই এর উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না। সেবাটিকে সফল ও টেকসই করতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত বাস, নির্ধারিত সময়ে চলাচল, যাত্রী নিরাপত্তা, চালক-কন্ডাক্টরদের প্রশিক্ষণ, ন্যায্য কর্মপরিবেশ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রুট সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় ১৪টি বাস দিয়ে শুরু হওয়া এই সেবা ভবিষ্যতে যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

এ উদ্যোগের সঙ্গে নারী কর্মীদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নারী যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যিনি পালন করবেন, তার নিজের নিরাপত্তা ও মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে।

ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই হোক সবচেয়ে বড় শক্তি

পিংক বাসের সাফল্য শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির ওপরও। নারী চালককে সম্মান করতে হবে, তার পেশাগত দক্ষতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং যাত্রী হিসেবে সবাইকে শৃঙ্খলা ও সৌজন্য বজায় রাখতে হবে।

নারী চালকের হাতে স্টিয়ারিং দেখলে অবাক হওয়ার দিন শেষ হওয়া উচিত। বরং সেটিকে স্বাভাবিক করে তুলতে হবে। কারণ একটি আধুনিক সমাজে কে কোন পেশায় কাজ করবেন, তা নির্ধারণ করবে তার যোগ্যতা—লিঙ্গ নয়।

পিংক বাস তাই কেবল গোলাপি রঙের একটি বাস নয়। এটি নিরাপদ যাত্রার প্রত্যাশা, নারীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তনের একটি প্রতীক।

আজ নারী যখন চালকের আসনে, তখন সমাজের কাজ তার পথ আটকে দেওয়া নয়—পথটি আরও নিরাপদ, সম্মানজনক ও প্রশস্ত করে দেওয়া।

চালকের আসনে নারী—এ দৃশ্য যত বেশি স্বাভাবিক হবে, নারীর অগ্রযাত্রাও তত বেশি শক্তিশালী হবে। আর সেই সফলতার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন