গণমাধ্যমের সামনে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার রূপরেখা
: রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন বিভেদ, বিদ্বেষ কিংবা প্রতিহিংসার রূপ না নেয়—এই বার্তাই স্পষ্টভাবে দিলেন বিএনপির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কর্মদিবসে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি যে বক্তব্য রাখলেন, তা শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার একটি প্রাথমিক রূপরেখা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
শনিবার রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দেশের প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার সম্পাদক, শীর্ষ নির্বাহী এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তারেক রহমান বলেন,
“সমালোচনা চাই, কিন্তু সেটি হতে হবে গঠনমূলক। শুধু বিরোধিতা নয়, সমাধানের পথ দেখানোই গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়।”
৫ আগস্টের অভিজ্ঞতা থেকে রাজনীতির নতুন পাঠ
তারেক রহমানের বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, ওই দিনের অভিজ্ঞতা রাজনীতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। হিংসা ও প্রতিহিংসার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ, তা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। সে কারণেই বিএনপি আর অতীতের পথে ফিরতে চায় না।
তার ভাষায়, “আমরা কোনোভাবেই ৫ আগস্টের আগের জায়গায় ফিরে যেতে চাই না। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাই দেশের সব সমস্যার একমাত্র সমাধান।”
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা
মতবিনিময় সভায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। সাংবাদিক নির্যাতনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মাহমুদুর রহমানের ওপর নির্যাতনের রক্তাক্ত ছবি আজও তার চোখের সামনে ভাসে। একই সঙ্গে রুহুল আমিন গাজীর কারাবন্দী অবস্থায় চিকিৎসাবঞ্চিত মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন,
“এই ঘটনাগুলো একত্রে দেখলে দেশের প্রকৃত বাস্তবতা বোঝা যায়।”
‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’: নারীকেন্দ্রিক রাষ্ট্রভাবনা
আগামী দিনে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে বিএনপির সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে—এ কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, তার সেই পরিকল্পনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে নারীর ক্ষমতায়ন। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রস্তাব তুলে ধরেন।
এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের একজন নারী—গৃহিণী—পাঁচ থেকে সাত বছর রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাবেন, যাতে তিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন। তারেক রহমানের মতে, দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারের জন্য এ উদ্যোগ নারীর আর্থসামাজিক অবস্থান বদলে দিতে পারে।
পানি সংকট, স্বাস্থ্য ও কৃষকের কথা
ঢাকার ভবিষ্যৎ পানি সংকট নিয়ে সতর্ক করে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, আগামী ১০–১৫ বছরের মধ্যে রাজধানীতে ভয়াবহ পানি সংকট দেখা দিতে পারে। বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার দূষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারকে তিনি বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন।স্বাস্থ্যখাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানান, যাদের বড় অংশই হবেন নারী। অন্যদিকে কৃষকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের দেড় কোটি কৃষকের কথা বলার কোনো কার্যকর ভেন্যু নেই—এটি রাষ্ট্রের বড় ব্যর্থতা।
তরুণ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান
তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য দিকনির্দেশনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব পরিকল্পনা দিয়েই তরুণদের আস্থা অর্জন করতে হবে। ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল শিক্ষার আধুনিকায়ন, বিদেশে দক্ষ শ্রমশক্তি পাঠানো এবং আইটি পার্ক ও ফ্রিল্যান্সিং খাত সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
নির্বাচন, জবাবদিহি ও সংস্কার
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় থেকে স্থানীয় সরকার সব স্তরে নির্বাচনের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন,
“আমি কারও ওপর আঘাত করতে চাই না। আসুন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও পরিবেশ এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা সবাই মিলে কাজ করি।”
সম্পাদকদের প্রত্যাশা ও সতর্কবার্তা
মতবিনিময় সভায় সম্পাদকদের বক্তব্যে উঠে আসে গত দেড় দশকের গণমাধ্যম নিপীড়নের চিত্র, ব্যাংক খাতে লুটপাট, মূল্যস্ফীতি, পুলিশ সংস্কার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো। অনেকেই তারেক রহমানকে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন, আবার কেউ কেউ সতর্ক করে বলেন—এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না।