• বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:৩৪ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

ছাত্র রাজনীতি অর্থের উৎস ও নৈতিক সংকট

বিপ্লব সিকদার / ৪৫ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

ছাত্র রাজনীতি একটি দেশের গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী,২৪ এর  আন্দোলনে ছাত্রসমাজ ছিল অগ্রভাগে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র রাজনীতির চরিত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আজকের বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উঠে আসে, তা হলো ছাত্র রাজনীতির অর্থের উৎস। বিশেষ করে যখন দেখা যায়—মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা, যারা মূলত মা–বাবার সীমিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তারাই প্রতিদিন নামিদামি রেস্তোরাঁয় খাচ্ছে, ব্যয়বহুল যানবাহনে চলাফেরা করছে এবং বিলাসী জীবনযাপন করছে—তখন স্বাভাবিকভাবেই সচেতন মহলে সন্দেহ ও উদ্বেগ তৈরি হয়।
প্রশ্ন জাগে, এই অর্থ আসছে কোথা থেকে? ছাত্র রাজনীতির নামে যারা মাঠে থাকে, মিছিল করে, সভা-সমাবেশে অংশ নেয়—তাদের অধিকাংশেরই নিজস্ব আয়ের কোনো স্থায়ী উৎস নেই। ফলে ধরে নেওয়াই যায়, কেউ না কেউ এই অর্থ জোগান দিচ্ছে। এই ‘কেউ’রা সাধারণত নিঃস্বার্থ নয়। বরং তারা শিক্ষার্থীদের আবেগ, তারুণ্যের শক্তি ও আদর্শবাদকে কৌশলে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা নিজেরাও বুঝতে পারে না, কখন তারা একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক খেলায় ব্যবহৃত হয়ে যাচ্ছে।
এই অর্থায়নের বড় একটি অংশ বৈধ পথে আসে না। চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাণিজ্য, দখলদারিত্ব, অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্য কিংবা বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে অর্থ সংগ্রহ—এসবই আজ ছাত্র রাজনীতির অর্থের উৎস হিসেবে আলোচিত। প্রথমদিকে এসব কাজকে অনেক ছাত্রই “দলের প্রয়োজনে” বা “সংগঠনের স্বার্থে” বলে যুক্তি দাঁড় করায়। কিন্তু ধীরে ধীরে এই অনৈতিক কাজগুলোই তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। আদর্শ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ তখন গৌণ হয়ে যায়; মুখ্য হয়ে ওঠে ক্ষমতা ও অর্থ।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা খুব অল্প বয়সেই বিপথগামী হয়ে পড়ে। যে বয়সে তাদের বই-খাতা, গবেষণা, সৃজনশীল চিন্তা ও ভবিষ্যৎ গঠনের পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই তারা অবৈধ অর্থের স্বাদ পেয়ে যায়। একসময় এই অর্থই তাদের জীবনধারার মানদণ্ড হয়ে ওঠে। পড়াশোনা পিছিয়ে যায়, ক্যারিয়ার অনিশ্চিত হয়, আর অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হওয়ার পর তারা সমাজের মূল ধারায় ফিরতে পারে না; বরং বিভিন্ন অপরাধচক্র বা দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হয়ে যায়।
এভাবে ছাত্র রাজনীতি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়। নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার বদলে তৈরি হয় পেশিশক্তিনির্ভর কর্মী; আদর্শিক রাজনীতির জায়গা দখল করে নেয় অর্থ ও ক্ষমতার রাজনীতি। এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা বাড়ে, শিক্ষা পরিবেশ নষ্ট হয়। দীর্ঘমেয়াদে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অঙ্কুরেই বিষ ঢেলে দেওয়া হয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন। প্রথমত, ছাত্র রাজনীতিতে অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোথা থেকে অর্থ আসছে, কীভাবে খরচ হচ্ছে—তার স্পষ্ট হিসাব থাকা জরুরি। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলোকে নৈতিক রাজনীতির চর্চা করতে হবে এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে—যাতে তারা বুঝতে পারে, স্বল্পমেয়াদি সুবিধার বিনিময়ে নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
ছাত্র রাজনীতি যদি আবার আদর্শ, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের পথে ফিরে আসে, তবেই তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হবে। অন্যথায়, অর্থের অবৈধ উৎসে পুষ্ট এই রাজনীতি শুধু ছাত্রদের নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যৎকেই প্রশ্নের মুখে।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন