• বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:০৫ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

তারুণ্যের শক্তি অপশক্তির কাছে জিম্মি হতে চলছে

বিপ্লব সিকদার / ২৯ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

তারুণ্য সব সময়ই সমাজ পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে—ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, স্বাধিকার আন্দোলন কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে—তারুণ্যের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। তারুণ্য মানেই স্বপ্ন, সাহস, প্রশ্ন করার ক্ষমতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতায় এক উদ্বেগজনক চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে—এই বিপুল সম্ভাবনাময় শক্তি ক্রমেই অপশক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে।
আজকের তরুণ সমাজ নানা সংকটে আক্রান্ত। বেকারত্ব, শিক্ষার মানের অবনতি, সামাজিক বৈষম্য, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের হতাশ করে তুলছে। এই হতাশা ও ক্ষোভকে পুঁজি করেই অপশক্তি তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, চরমপন্থী মতাদর্শ, সহিংসতার সংস্কৃতি কিংবা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা—সবকিছুতেই তরুণদের সামনে এগিয়ে রাখা হচ্ছে ঢাল হিসেবে। ফলাফল হিসেবে তারুণ্যের সৃজনশীল শক্তি ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে ব্যয় হচ্ছে।
বিশেষ করে রাজনীতির অঙ্গনে তারুণ্যের ব্যবহার আজ সবচেয়ে উদ্বেগজনক। আদর্শভিত্তিক রাজনীতির পরিবর্তে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে তরুণদের হাতিয়ার বানানো হচ্ছে। ক্যাম্পাস রাজনীতি থেকে শুরু করে রাজপথ—সব জায়গায় তরুণদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে সংঘাত ও সহিংসতার লাইনে। সিদ্ধান্ত নেয় কেউ অন্যরা, অথচ দায় বহন করতে হয় তরুণদেরই। এতে একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক চর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তরুণদের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অপশক্তির আরেকটি বড় হাতিয়ার হলো বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা খবর, উগ্র বক্তব্য এবং বিদ্বেষমূলক প্রচারণার সহজলভ্যতা তরুণদের মনকে দ্রুত প্রভাবিত করছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া আবেগের বশে তারা অনেক সময় এমন অবস্থান নিচ্ছে, যা সমাজকে বিভক্ত করছে এবং সহনশীলতাকে ধ্বংস করছে। চিন্তার গভীরতা ও যুক্তিবোধের জায়গায় আবেগ আর উসকানিই প্রাধান্য পাচ্ছে।
এই সংকটের জন্য শুধু তরুণদের দায়ী করলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং সমাজ—সবাই কোনো না কোনোভাবে দায়ী। শিক্ষাব্যবস্থা যদি কেবল পরীক্ষানির্ভর হয়, যদি সেখানে মানবিক মূল্যবোধ, যুক্তিবাদী চিন্তা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ শেখানো না হয়, তবে তরুণরা সহজেই ভুল পথে পরিচালিত হবে। একইভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে হতাশ তরুণ অপশক্তির প্রলোভনে পা বাড়াতেই পারে।
তারুণ্যকে জিম্মি হওয়ার এই প্রবণতা থেকে মুক্ত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন আদর্শ ও মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্ব। রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনে তরুণদের কেবল কর্মী হিসেবে নয়, চিন্তাশীল অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাদের প্রশ্ন করার অধিকার, ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে হতে হবে মুক্ত চিন্তার কেন্দ্র, যেখানে সহিংসতা নয়, যুক্তি ও সংলাপ হবে প্রধান হাতিয়ার।
একই সঙ্গে তরুণদের নিজেদের মধ্যেও আত্মসমালোচনার জায়গা তৈরি করতে হবে। আবেগের বশে নয়, বিবেক ও যুক্তির আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, তারুণ্যের শক্তি ধ্বংসের জন্য নয়, নির্মাণের জন্য। অপশক্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠা মানে নিজের ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করা।
সবশেষে বলা যায়, তারুণ্য যদি জিম্মি হয়ে পড়ে, তবে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে ওঠে। তাই এই শক্তিকে মুক্ত, সচেতন ও দায়িত্বশীল রাখার দায়িত্ব সবার। রাষ্ট্রকে ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, সমাজকে দিতে হবে নৈতিক দিশা, আর তরুণদের নিতে হবে সচেতন অবস্থান। তাহলেই তারুণ্যের শক্তি অপশক্তির হাত থেকে মুক্ত হয়ে সত্যিকার অর্থে দেশ ও সমাজ গঠনের কাজে নিয়োজিত হতে পারবে।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন