সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামো বদলেছে বহুবার। সংবিধান সংশোধন, আইন সংস্কার, নীতিমালা হালনাগাদ—সবই হয়েছে কাগজে-কলমে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এসব সংস্কার কি মানুষের চিন্তা, মানসিকতা ও মূল্যবোধে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পেরেছে? বাস্তবতা হলো, কাগজের সংস্কার যতই হোক না কেন, মানুষের মগজের সংস্কার না হলে সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
কাগজের সংস্কার বলতে আমরা সাধারণত আইন, বিধি, নীতিমালা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম পরিবর্তনকে বুঝি। এগুলো নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। আইন না থাকলে সমাজে শৃঙ্খলা থাকে না, রাষ্ট্র অচল হয়ে পড়ে। কিন্তু আইন কার্যকর হয় তখনই, যখন মানুষ তা মানতে আন্তরিক হয়। যদি মানুষের মানসিকতা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, নৈতিকতা দুর্বল হয়, তবে সবচেয়ে সুন্দর আইনও কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।আমাদের সমাজে এর বহু উদাহরণ দেখা যায়। দুর্নীতিবিরোধী আইন আছে, কিন্তু দুর্নীতি কমে না। নারী অধিকার রক্ষার আইন আছে, তবু নারী নির্যাতন থামে না। পরিবেশ সংরক্ষণের আইন আছে, অথচ নদী দূষণ ও বন উজাড় চলতেই থাকে। কারণ, সমস্যার মূল জায়গায় মানুষের চিন্তাধারা ও মূল্যবোধে—পরিবর্তন আসেনি। বাহ্যিক সংস্কার হয়েছে, কিন্তু ভেতরের মানুষটি বদলায়নি।
মগজের সংস্কার বলতে বোঝায় চিন্তার প্রসার, নৈতিক বোধের বিকাশ এবং দায়িত্বশীল মানসিকতা তৈরি করা। এটি আসে শিক্ষা, পরিবার, সংস্কৃতি ও সামাজিক চর্চার মাধ্যমে। যদি শিশুকাল থেকেই মানুষকে সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও যুক্তিবোধ শেখানো হয়, তবে সে বড় হয়ে আইন ভাঙার পথ বেছে নেবে না। তখন আইন হবে সহায়ক, ভয়ের বস্তু নয়।
আসলে কাগজের সংস্কার হলো উপরের স্তরের পরিবর্তন, আর মগজের সংস্কার হলো শিকড়ে হাত দেওয়া। গাছের পাতা ছাঁটলে গাছ সুন্দর দেখাতে পারে, কিন্তু শিকড় পচে গেলে গাছ একদিন না একদিন শুকিয়ে যাবেই। তেমনি, মানুষের মানসিকতা অপরিবর্তিত রেখে শুধু নিয়ম-কানুন বদলালে সমাজের ভিত মজবুত হয় না।
সুতরাং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই সমাজ গড়তে হলে আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে মগজের সংস্কারকে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা ও চিন্তাশক্তির চর্চা, পরিবারে মূল্যবোধের শিক্ষা এবং সমাজে ইতিবাচক আচরণের উদাহরণ—এসবের মাধ্যমেই প্রকৃত সংস্কার সম্ভব। কাগজের সংস্কার দরকার, তবে তার চেয়েও বেশি দরকার মানুষের মন ও মগজের সংস্কার। কারণ বদল আসে আগে মানুষের ভেতর থেকে, তারপর কাগজে।