• বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৩ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

টেকসই অবকাঠামো সংকটে মেঘনা উপজেলা

বিপ্লব সিকদার / ৯২ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬

মেঘনা উপজেলা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবেষ্টিত জনপদ। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এ অঞ্চলের মাটিতে বালুর পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। নদীভাঙন, চরাঞ্চল বিস্তার এবং প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে এখানকার ভূপ্রকৃতি স্থিতিশীল নয়। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে অবকাঠামো নির্মাণ করায় টেকসই উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। কাঁচা ও পাকা সড়ক বৃষ্টি হলেই ধসে পড়ে, সরকারি ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়, আর জনগণের দুর্ভোগ বাড়ে। ফলে উন্নয়নের নামে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার সুফল দীর্ঘমেয়াদে মিলছে না।
মেঘনা উপজেলার সড়ক অবকাঠামো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। বর্ষা মৌসুমে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই গ্রামীণ সড়ক কাদায় পরিণত হয়। পাকা সড়কের ওপরকার বিটুমিন স্তর উঠে যায়, কোথাও কোথাও দেবে যায়। এর প্রধান কারণ, নির্মাণের আগে মাটির গুণগত পরীক্ষা ও উপযুক্ত ভিত্তি নির্মাণের ঘাটতি। বালুময় মাটিতে সাধারণ পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ করলে তা টেকসই হয় না—এটি প্রকৌশলবিদ্যার প্রাথমিক সত্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, দ্রুত কাজ শেষ করার তাড়াহুড়ো, বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা কিংবা অনিয়মের কারণে মানসম্মত নির্মাণ নিশ্চিত হয় না।
শুধু সড়ক নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সরকারি কার্যালয়ের ভবনও একই সমস্যায় আক্রান্ত। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, যথাযথ তদারকির অভাব এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার ঘাটতি অবকাঠামোকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। বর্ষাকালে ভবনের দেয়ালে ফাটল, মেঝে দেবে যাওয়া কিংবা ছাদ চুইয়ে পানি পড়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এতে সরকারি অর্থের অপচয় যেমন হয়, তেমনি জনসেবাও ব্যাহত হয়।
মেঘনা উপজেলার অর্থনীতি কৃষি, মৎস্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সড়ক যোগাযোগ দুর্বল হওয়ায় কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়। বৃষ্টি হলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, রোগীরা সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না। একটি অবকাঠামোগত দুর্বলতা কেবল যাতায়াত সমস্যাই সৃষ্টি করে না; এটি সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।
এ পরিস্থিতির পেছনে প্রাকৃতিক কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানবসৃষ্ট কারণ। দুর্নীতি, অনিয়ম ও জবাবদিহিতার অভাব সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রকল্পের কাগজে-কলমে যে মানদণ্ডের কথা উল্লেখ থাকে, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে তদারকির দুর্বলতা উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়। ফলে একই সড়ক বারবার সংস্কার করতে হয়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসে না।
টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা বিবেচনা করা। বালুময় মাটির জন্য বিশেষ প্রকৌশল কৌশল প্রয়োগ করতে হবে—যেমন গভীর ভিত্তি নির্মাণ, জিও-টেক্সটাইল ব্যবহার, মাটির সংহতি বৃদ্ধি এবং উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বাঁধ ও প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে, যাতে প্রতি বর্ষায় নতুন করে ক্ষয়ক্ষতি না হয়।
একই সঙ্গে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। কাজের মান পর্যবেক্ষণে স্বাধীন তদারকি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহার—যেমন জিপিএস মনিটরিং, অনলাইন প্রতিবেদন ও উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার—দুর্নীতি কমাতে সহায়ক হতে পারে। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সরকারি অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে এবং প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে মেঘনা উপজেলার অবকাঠামো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে। উন্নয়ন মানে কেবল দৃশ্যমান স্থাপনা নয়; উন্নয়ন মানে স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের আস্থা। যদি আজ বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা যায়, তবে আগামী প্রজন্ম একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ মেঘনা পাবে।

লেখক -সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন