কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা—ঢাকার অদূরে নদীবেষ্টিত একটি জনপদ, যেখানে মেঘনা ও কাঠালিয়া নদীর মাঝে গড়ে উঠেছে ৮টি ইউনিয়ন ও ১০৫টি গ্রাম নিয়ে বিস্তৃত জনবসতি। ভৌগোলিকভাবে সম্ভাবনাময় এই উপজেলাটি কুমিল্লা-২ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ একাধিক পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কৃষি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, সামাজিক অবক্ষয় এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সমন্বয়ে এক ধরনের অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এখন প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে দৃশ্যমান। অনেক এলাকায় সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে ভয় পান।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সামাজিক সুরক্ষা বলতে যে ন্যূনতম নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার নিশ্চয়তা থাকা দরকার, সেটিই এখন অনুপস্থিত। একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, ছোটখাটো বিরোধ বা জমিজমা সংক্রান্ত সমস্যা মীমাংসার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং বিরোধ আরও জটিল আকার নিচ্ছে।এছাড়া মাদক সমস্যাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা না হলেও নদীপথ ব্যবহার করে সহজেই মাদক প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কিছু প্রভাবশালী চক্র এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে তরুণ সমাজের একটি অংশ দ্রুত বিপথগামী হচ্ছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতাও সামাজিক শৃঙ্খলা ভাঙনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার ও প্রভাব খাটানোর প্রতিযোগিতা প্রায়ই সংঘর্ষের রূপ নিচ্ছে। এতে সাধারণ জনগণ হয়ে পড়ছেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগও পাওয়া যায়।
প্রশাসনের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে প্রশ্নের মুখে। যদিও উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করছে, তবে তা পরিস্থিতির তুলনায় পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল। অনেকেই বলছেন, স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় সমাজ একসঙ্গে কাজ করবে।সচেতন মহল মনে করেন, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সুফল যেন স্থানীয় মানুষ সরাসরি পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন শিক্ষিত মুরুব্বি বলেন, মেঘনার মতো সম্ভাবনাময় একটি উপজেলায় সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার এই ভাঙন শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ার জন্যও একটি সতর্ক সংকেত। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।