• শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

উপাসনালয়ে রাজনীতি সমাজকে বিভক্ত করে

বিপ্লব সিকদার / ৩২ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে উপাসনালয় শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের স্থান নয়; এটি নৈতিক শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানবিক মূল্যবোধের কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচিত হয়ে এসেছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা কিংবা অন্য যেকোনো উপাসনালয় মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও শান্তির বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে, এমনকি বাংলাদেশেও, উপাসনালয়ের ভেতরে কিংবা এর আশপাশে রাজনৈতিক আলোচনা, দলীয় প্রচারণা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বিষয়টি উদ্বেগজনকভাবে সামনে আসছে। বিষয়টি শুধু ধর্মীয় পরিবেশের জন্য নয়, সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ধর্ম মানুষের আত্মার বিষয়, আর রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়। উভয়ের উদ্দেশ্য জনকল্যাণ হলেও তাদের কার্যপরিধি ভিন্ন। যখন ধর্মীয় স্থানকে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার কিংবা দলীয় সমর্থন আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ধর্মের পবিত্রতা যেমন ক্ষুণ্ন হয়, তেমনি রাজনীতিও তার নৈতিক ভিত্তি হারাতে শুরু করে। ফলে সৃষ্টি হয় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সামাজিক অস্থিরতা।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় উপাসনালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মিলনস্থল হিসেবে কাজ করেছে। গ্রামের মসজিদে নামাজ শেষে এলাকার উন্নয়ন, দরিদ্র মানুষের সহযোগিতা কিংবা সামাজিক সমস্যা সমাধানের আলোচনা হয়েছে। মন্দিরে উৎসবের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছে। কিন্তু যখন এসব স্থানে রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন ঐক্যের জায়গাটি বিভক্তির কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।রাজনীতির একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো মতপার্থক্য। গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত থাকবে, বিতর্ক থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে। কিন্তু উপাসনালয়ের মূল দর্শন হলো মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করা। যখন রাজনৈতিক বিভাজন ধর্মীয় স্থানে প্রবেশ করে, তখন মানুষ নিজেদের প্রথমে রাজনৈতিক পরিচয়ে এবং পরে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে দেখতে শুরু করে। এর ফলে একই উপাসনালয়ে যাতায়াতকারী মানুষের মধ্যেও দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থের সংমিশ্রণ সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে যতটা প্রভাব ফেলতে পারে, ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে উপস্থাপিত রাজনৈতিক বক্তব্য তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। এই সুযোগকে ব্যবহার করে যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়, তাহলে তা সমাজে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করার ফলে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, কোথাও গৃহযুদ্ধ, আবার কোথাও চরমপন্থার বিস্তার ঘটেছে। যদিও বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন, তবুও অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। কারণ সামাজিক সম্প্রীতি একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনর্গঠন করতে অনেক সময় ও শ্রম প্রয়োজন হয়।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তরুণ প্রজন্ম। উপাসনালয়ে আগত তরুণরা সেখানে নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করতে আসে। কিন্তু যদি তারা ধর্মীয় পরিবেশের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিরোধ, দলীয় সমালোচনা কিংবা ক্ষমতার প্রতিযোগিতার চিত্র দেখতে পায়, তাহলে তাদের মনে ধর্ম ও রাজনীতি সম্পর্কে বিভ্রান্ত ধারণা তৈরি হতে পারে। এটি ভবিষ্যতে সমাজের জন্য নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনতে পারে।
অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় পর্যায়ে উপাসনালয় পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়েও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়। কে সভাপতি হবেন, কে সম্পাদক হবেন কিংবা কোন গোষ্ঠীর প্রভাব থাকবে এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। ফলে উপাসনালয়ের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যায়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা দলীয় দ্বন্দ্ব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেও বিভাজন তৈরি করে।তবে এ কথাও সত্য যে ধর্মীয় নেতারা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ, মাদকবিরোধী আন্দোলন, শিক্ষার প্রসার কিংবা মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু জনস্বার্থের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া এবং দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান প্রচার করা এক বিষয় নয়। সমাজকল্যাণমূলক বার্তা প্রদান ধর্মীয় দায়িত্বের অংশ হতে পারে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া উপাসনালয়ের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকারও স্বীকৃত। কিন্তু এই দুটি অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্র আলাদা। রাজনৈতিক সভা, সমাবেশ, আলোচনা ও প্রচারণার জন্য নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। উপাসনালয়কে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বানানো হলে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি বক্তব্য মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে উপাসনালয়ে দেওয়া কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দ্রুত বিতর্ক ও উত্তেজনার কারণ হতে পারে। অনেক সময় একটি অসতর্ক মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। তাই বর্তমান বাস্তবতায় আরও বেশি দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।উপাসনালয়ের পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব শুধু ধর্মীয় নেতাদের নয়; সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষেরও। রাজনৈতিক নেতাদের উচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করা। একইভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদেরও সচেতন থাকতে হবে, যাতে কোনো পক্ষ উপাসনালয়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে না পারে। প্রশাসনেরও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নজরদারি থাকা উচিত, তবে তা অবশ্যই ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মনে রাখতে হবে যে ধর্ম মানুষকে একত্রিত করার জন্য, বিভক্ত করার জন্য নয়। উপাসনালয় হলো শান্তি, সহনশীলতা ও মানবিকতার প্রতীক। সেখানে যদি রাজনৈতিক বিভাজনের ভাষা প্রবেশ করে, তাহলে সমাজের ঐক্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আর সেই দুর্বলতা একসময় বৃহত্তর সামাজিক অস্থিরতার রূপ নিতে পারে।বাংলাদেশ বহু ধর্ম, মত ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থানের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এই সম্প্রীতির ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। উপাসনালয়কে তার মূল ভূমিকা আধ্যাত্মিক চর্চা, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক ঐক্যের কেন্দ্র হিসেবেই রাখতে হবে। অন্যথায় সাময়িক রাজনৈতিক লাভের জন্য এমন এক বিভাজনের বীজ বপন হতে পারে, যার ফল ভোগ করতে হবে পুরো সমাজকে।সামাজিক স্থিতিশীলতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে উপাসনালয়কে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখা সময়ের দাবি। কারণ সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য যতটা প্রয়োজন উন্নয়ন, ততটাই প্রয়োজন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ। আর সেই বিশ্বাসের অন্যতম আশ্রয়স্থল হলো উপাসনালয়। সেটিকে বিভাজনের নয়, ঐক্যের কেন্দ্র হিসেবেই সংরক্ষণ করতে হবে।

লেখক -সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন