মেঘনায় ডাচ্-বাংলা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে তদারকি ব্যবস্থা
গ্রাহকের আঙুলের ছাপ, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য আর দীর্ঘদিনের বিশ্বাস—এই তিন অস্ত্র ব্যবহার করেই কি গড়ে উঠেছিল একটি নীরব প্রতারণার জাল?
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার মানিকারচর বাজারে অবস্থিত ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংকিং সেন্টারকে ঘিরে এমনই এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। সেন্টারের ট্রেইনার আফরান সুলতানের বিরুদ্ধে ১১ জন গ্রাহকের হিসাব থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ রাখলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন—এতদিন ধরে চলা অনিয়ম কারও নজরে এলো না কেন?
অভিযোগের কেন্দ্রে ট্রেইনার
মেঘনা থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগে সাব-এজেন্ট ও মাস্টার এজেন্ট শফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, অভিযুক্ত আফরান সুলতানা বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকদের হিসাব থেকে মোট ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রাহকদের অজান্তে তাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ব্যাংকিং তথ্য ব্যবহার করে অর্থ প্রথমে অন্য একটি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। পরে সেই অর্থ নগদ উত্তোলন করা হয়। অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে, অর্থের একটি বড় অংশ অভিযুক্তের স্বামীর ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরিত হয়েছে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘সার্ভার সমস্যা’ ছিল কি প্রতারণার ঢাল?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক কিছু তথ্য। একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, টাকা জমা দেওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে তাদের কোনো রশিদ দেওয়া হয়নি। কখনো বলা হয়েছে সার্ভার সমস্যা, কখনো বলা হয়েছে পরে মোবাইলে এসএমএস চলে যাবে।
বটতলী গ্রামের শাহিনুর বেগম বলেন,
“আমি পাঁচ লাখ টাকা জমা দেওয়ার পর রশিদ চাইলে বলা হয় পরে মেসেজ যাবে। কিন্তু কোনো মেসেজ পাইনি। পরে ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি আমার মতো আরও অনেকে একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।”
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রাহককে রশিদ না দেওয়া এবং বারবার প্রযুক্তিগত সমস্যার অজুহাত দেখানো গুরুতর অনিয়মের লক্ষণ হতে পারে।
কীভাবে ব্যবহার করা হয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট?
এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহকের বায়োমেট্রিক তথ্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন বা স্থানান্তর সম্ভব। ফলে কোনো অসাধু ব্যক্তি যদি গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে এবং তার বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পায়, তাহলে জালিয়াতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে বর্তমান অভিযোগে ঠিক কী পদ্ধতিতে অর্থ সরানো হয়েছে, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
অভিযোগ ওঠার পরই ‘নীরবতা’
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্ত আফরান সুলতানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একবার ফোন ধরলেও সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে তার মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই তিনি জনসমক্ষে খুব একটা দেখা দিচ্ছেন না।
ব্যাংকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে কী মিলেছে?
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কুমিল্লা জেলা সেলস অফিসার এ বি মনয়জ সরকার জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি প্রাথমিকভাবে তদন্ত করা হয়েছে।
তার ভাষায়,
“জিজ্ঞাসাবাদের সময় অভিযুক্ত প্রথমে কিছু বিষয় স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করেন। বিষয়টি প্রধান কার্যালয়ে জানানো হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এজেন্ট ব্যাংকিং সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।
বড় প্রশ্ন: নজরদারি কোথায় ছিল?
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে তদারকি ব্যবস্থা।
যদি অভিযোগ অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক গ্রাহকের হিসাব থেকে ধাপে ধাপে প্রায় ২০ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হলো কেন?
ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, একই ব্যক্তি বা একই ধরনের লেনদেনের পুনরাবৃত্তি হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
পুলিশের তদন্ত শুরু
মেঘনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগে সংযুক্ত ব্যাংক স্টেটমেন্ট, লেনদেনের তথ্য এবং অন্যান্য নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রতারণা, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আতঙ্কে গ্রাহকরা
ঘটনার পর স্থানীয় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই নিজেদের হিসাবের লেনদেন পুনরায় যাচাই করছেন। কেউ কেউ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পরিবর্তে সরাসরি ব্যাংক শাখায় লেনদেন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মেঘনার এই আলোচিত ঘটনায় এখন সবার নজর ব্যাংকের অডিট রিপোর্ট এবং পুলিশের তদন্তের দিকে। কারণ অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে এটি শুধু একজন কর্মীর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ নয়; বরং গ্রামীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও তদারকি কাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দেখা দিতে পারে।