• রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০২:০৯ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ

কক্সবাজারে পর্যটন সংকট: সৌন্দর্যের আড়ালে নিরাপত্তার প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিনিধি / ৬৫ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
oplus_2

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজার। প্রতি বছর লাখো দেশীয় পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এই পর্যটন নগরী। অথচ আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে কক্সবাজারের অবস্থান এখনও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের জন্য যে সমুদ্রসৈকত একটি স্বপ্নের গন্তব্য হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে সেখানে বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। পর্যটন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এর পেছনে শুধু প্রচারণার ঘাটতি নয়, বরং নিরাপত্তা, সুশাসন, হয়রানি, অপরাধচক্রের সক্রিয়তা এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠেছে।
কক্সবাজারে আগত দেশীয় ও বিদেশি পর্যটকদের একটি অংশের অভিযোগ, সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন ধরনের অসাধু চক্র। পর্যটননির্ভর এই শহরে পরিবহন, আবাসন, বিনোদন এবং অনানুষ্ঠানিক সেবা খাতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী নেটওয়ার্ক। এসব নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ থাকলেও সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান প্রতিকার পাওয়া যায় না।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারে বিপুল সংখ্যক অস্থায়ী ব্যবসা ও অনানুষ্ঠানিক সেবাদাতা সক্রিয় হয়ে ওঠে। পর্যটকদের একটি অংশ অভিযোগ করেন, বিমানবন্দর, বাস টার্মিনাল কিংবা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নামার পর থেকেই তাদের বিভিন্ন প্রস্তাব, দালালি কিংবা কমিশনভিত্তিক সেবার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক পর্যটক মনে করেন, তারা একটি পরিকল্পিত বাণিজ্যিক চাপের মধ্যে পড়ে যান, যা একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরীর জন্য মোটেও ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।পর্যটনসংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারে কমিশনভিত্তিক একটি অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। কোনো পর্যটক কোথায় উঠবেন, কোথায় খাবেন, কোথায় ঘুরবেন কিংবা কোন যানবাহন ব্যবহার করবেন এসব সিদ্ধান্তের পেছনে অনেক সময় কমিশননির্ভর সুপারিশ কাজ করে। ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ও সেবার মানের পরিবর্তে কমিশন ব্যবস্থাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে পর্যটকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যান।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পর্যটকদের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভ্রমণবিষয়ক অনলাইন ফোরাম এবং বিভিন্ন পর্যটকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় প্রায়ই প্রতারণা, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ব্ল্যাকমেইল এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ফাঁদের অভিযোগ উঠে আসে। যদিও এসব অভিযোগের সবকটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়, তবুও অভিযোগের পুনরাবৃত্তি একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়—কেন একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে?
পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, কোনো শহরে যদি পর্যটক নিরাপদ বোধ না করেন, তাহলে সেই শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও পর্যটন শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। কক্সবাজারের ক্ষেত্রে এ বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সৈকত, পাহাড়, প্রবাল দ্বীপ, সামুদ্রিক খাবার এবং অনন্য ভূপ্রকৃতি থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে শহরটি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য হয়ে উঠতে পারেনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন সময় পর্যটক ও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, অপরাধ দমনে কঠোর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। আবার অন্যদিকে কিছু পর্যটক অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, হয়রানি বা প্রশাসনিক জটিলতার অভিযোগও করেছেন। ফলে একদিকে অপরাধের আশঙ্কা, অন্যদিকে প্রশাসনিক অস্বস্তি দুই ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটনকেন্দ্রিক অপরাধ সাধারণ অপরাধের চেয়ে ভিন্ন। এখানে লক্ষ্য থাকে পর্যটকের অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য, সামাজিক অবস্থান বা মানসম্মান। ফলে এসব অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষায়িত পর্যটন পুলিশ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে অভিযোগ রয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রতিকার পান না অথবা অভিযোগ করতেই অনীহা প্রকাশ করেন।বিদেশি পর্যটকদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই রকম। আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন বিদেশি পর্যটকের খারাপ অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্লগ বা ভিডিওর মাধ্যমে কয়েক লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা পুরো গন্তব্যের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম।পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, কক্সবাজারের প্রধান সংকট অবকাঠামোর অভাব নয়; বরং সুশাসনের অভাব। শহরে বড় বড় হোটেল হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণকাজ এগিয়েছে, নতুন সড়ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু পর্যটকের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও আস্থার প্রশ্নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। একটি পর্যটন নগরীর প্রকৃত শক্তি তার ভবন বা স্থাপনা নয়, বরং তার ব্যবস্থাপনা।কক্সবাজারের অর্থনীতি মূলত পর্যটননির্ভর। ফলে পর্যটকদের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও হুমকি। একজন অসন্তুষ্ট পর্যটক ভবিষ্যতে নিজে না আসার পাশাপাশি অন্যদেরও নিরুৎসাহিত করেন। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, পর্যটনকেন্দ্রিক অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পর্যটকদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, অনানুষ্ঠানিক দালালচক্র ও কমিশননির্ভর নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। চতুর্থত, পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
কক্সবাজার বাংলাদেশের গর্ব। এটি শুধু একটি সমুদ্রসৈকত নয়, বরং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির অন্যতম প্রতীক। কিন্তু সেই প্রতীকের ওপর যদি অপরাধ, হয়রানি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার ছায়া পড়ে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো দেশের পর্যটন শিল্প। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত থাকার পরও বিদেশি পর্যটকের স্বল্প উপস্থিতি তাই কেবল পর্যটন খাতের ব্যর্থতা নয়; এটি সুশাসন, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
কক্সবাজারকে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সৌন্দর্যের প্রচারণার পাশাপাশি নিরাপত্তা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন