• মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০২:২৭ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

খাসজমি দখলের দ্বন্দ্বে রণক্ষেত্র চর

বিপ্লব সিকদার / ৪৭ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

প্রশাসনিক উদাসীনতা নাকি প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া?

মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরগুলো একসময় ছিল কৃষকের স্বপ্ন, ভূমিহীন মানুষের আশ্রয় এবং জীবিকার নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু সেই চর এখন রক্তাক্ত সংঘর্ষ, মামলা-মোকদ্দমা, দখলবাজি এবং প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ কুমিল্লার মেঘনা ও তিতাস উপজেলার সীমান্তবর্তী চর বিনোদনপুরে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আবারও সামনে নিয়ে এসেছে বহু পুরনো প্রশ্ন—সরকারি খাসজমি উদ্ধার হয়নি কেন? দীর্ঘদিনের বিরোধের স্থায়ী সমাধান হলো না কেন? আর সংঘর্ষের আগাম আভাস থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করছিল?
সোমবার সকালে চর বিনোদনপুর কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দেশীয় অস্ত্র, টেঁটা, রামদা, হকিস্টিক ও ইট-পাটকেলের আঘাতে আহত হন অন্তত ৩০ জন। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সংঘর্ষের বীজ রোপিত হয়েছিল বহু বছর আগে।
রেকর্ডের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিরোধ
স্থানীয় সূত্র, ভূমি অফিস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯০ সালে আলীপুর গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দাকে ১৪.৭৫ একর জমি লিজ দেওয়া হয়। পরে ১৯৯৯ সালে নতুন বাটেরা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার অনুকূলে আরও ১০.১৪ একর জমি লিজ দেওয়া হয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধ জটিল আকার ধারণ করে। কারণ সিএস ও এসএ রেকর্ডে ব্যক্তিমালিকানার তথ্য থাকলেও বিএস রেকর্ডে জমিটি সরকারি খাসজমি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন।
ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিএস রেকর্ড সাধারণত সর্বশেষ জরিপ হিসেবে বিবেচিত হয়। যদি সত্যিই জমিটি বিএস রেকর্ডে খাসজমি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—সরকারি জমি বছরের পর বছর ব্যক্তিগত দখলে থাকল কীভাবে?
সরকারের জমি, কিন্তু সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই!
অনুসন্ধানে স্থানীয়দের একটি অভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, প্রশাসনের নীরবতা এবং কার্যকর উদ্যোগের অভাবেই বিরোধ আজ রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
স্থানীয় একাধিক প্রবীণ ব্যক্তি জানান, বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে বহুবার সালিশ-বৈঠক হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের প্রতিনিধিরাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু জমির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ, সীমানা চিহ্নিতকরণ কিংবা খাসজমি উদ্ধার—কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে জমির মালিকানা প্রশ্নে দুই পক্ষের মধ্যে ক্রমাগত অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
একজন স্থানীয় কৃষক বলেন,
“সরকার যদি জমি নিজের দখলে নিত, তাহলে আজকে মানুষকে রক্ত দিতে হতো না।”
মামলার আড়ালে দখল রাজনীতি
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে আদালতে বিভিন্ন মামলা চলমান রয়েছে। কিন্তু মামলার নিষ্পত্তি না হওয়াকে কেন্দ্র করে এক ধরনের দখল সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
যখনই কোনো পক্ষ জমিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, তখনই অন্য পক্ষ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ফলে আইনি সমাধানের পরিবর্তে শক্তির প্রদর্শনই বিরোধের প্রধান নিয়ামকে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলা থাকলে প্রশাসন অনেক সময় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে চায় না। আর সেই সুযোগেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো মাঠ দখলের রাজনীতি চালিয়ে যায়।
একই শেকড়ের মানুষ, বিভক্ত দুই শিবির
অনুসন্ধানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। চর বিনোদনপুরের অধিকাংশ বাসিন্দার আদি নিবাস মেঘনা উপজেলার আলীপুর ঘাট সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায়।
নদীভাঙন, চর জাগা এবং জীবিকার তাগিদে বছরের পর বছর ধরে মানুষ চরাঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে। ফলে আজ যাদের একপক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তাদের অনেকেই আত্মীয়-স্বজন, শ্বশুরবাড়ি কিংবা রক্তের সম্পর্কের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু জমির মূল্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়েছে। অর্থনৈতিক স্বার্থ এখন সম্পর্কের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
গোয়েন্দা নজরদারি কোথায় ছিল?
সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—এই সংঘর্ষ কি সত্যিই আকস্মিক? নাকি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য অন্তরালে কোন শক্তি কাজ করেছে?
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকদিন ধরেই এলাকায় গুঞ্জন  বিরাজ করছিল। উভয় পক্ষের লোকজন সমবেত হচ্ছিল। সংঘর্ষের আশঙ্কার কথাও প্রকাশ্যে আলোচনা হচ্ছিল। এমনকি আলীপুর ঘাট থেকে যখন ট্রলার গুলো নদীর ঐপাড়ের উদ্দেশ্য রওনা হচ্ছে ঠিক তখনই আল্লাহু আকবর তাকবির দিচ্ছিল। ইট – পাটকেল নিক্ষেপের ফলে ট্রলারে থাকা লোক গুলো উপরে উঠতে পারেনি এবং আহত হবার খবর পাওয়া গেছে। তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে কোনো তথ্য ছিল না?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শতাধিক মানুষকে সংঘর্ষে নামানো, দেশীয় অস্ত্র সংগ্রহ করা এবং পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়। সাধারণত এমন পরিস্থিতির আগে এলাকায় নানা ধরনের সংকেত দেখা যায়।
প্রশ্ন উঠেছে, সেই সংকেতগুলো কি উপেক্ষিত হয়েছে, নাকি গুরুত্বই দেওয়া হয়নি?
নেপথ্যে কি প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠী?
চরাঞ্চলের জমি নিয়ে বিরোধের পেছনে আরেকটি বিষয় বারবার সামনে আসে—অর্থনৈতিক স্বার্থ।
একসময় অনাবাদি মনে হলেও বর্তমানে চরাঞ্চলের জমির মূল্য বহুগুণ বেড়েছে। কৃষি উৎপাদন, মাছ চাষ, বালু ব্যবসা এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কারণে এসব জমি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষ সংঘর্ষে জড়ালেও আড়ালে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি পরিস্থিতিকে উসকে দিচ্ছেন।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো প্রকাশ্য কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো যাচাইয়ের দাবি রাখে।
প্রশাসনের ব্যর্থতা নাকি সমন্বয়ের অভাব?
ভূমি প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগও রয়েছে।
একদিকে ভূমি রেকর্ড নিয়ে বিরোধ, অন্যদিকে দখল ও পাল্টা দখলের চেষ্টা—এই দুইয়ের মাঝখানে প্রশাসন কার্যকর অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ফলে বছরের পর বছর ধরে বিরোধ জমাট বেঁধে এখন সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
কী হতে পারে সমাধান?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘর্ষ বন্ধ করতে হলে কেবল পুলিশ মোতায়েন করলেই হবে না।
প্রথমত, বিরোধপূর্ণ জমির সর্বশেষ রেকর্ড যাচাই করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি খাসজমি হলে তা অবিলম্বে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে।
তৃতীয়ত, জরুরি ভিত্তিতে ডিজিটাল জরিপ ও সীমানা নির্ধারণ করতে হবে।
চতুর্থত, সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তি নয়, উসকানিদাতা এবং অর্থদাতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
পঞ্চমত, গোয়েন্দা ব্যর্থতা থাকলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
শেষ কথা
চর বিনোদনপুরের রক্তাক্ত সংঘর্ষ কেবল একটি স্থানীয় ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের চরাঞ্চল ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের সংকটের প্রতিচ্ছবি।
যে জমি নিয়ে বিরোধ, সেটি যদি সত্যিই সরকারি খাসজমি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্নের মুখে পড়ে রাষ্ট্রের ভূমি ব্যবস্থাপনা। আর যদি মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি থেকেই থাকে, তাহলে সেই বিভ্রান্তি দূর করার দায়িত্বও প্রশাসনের।একটি বিষয় স্পষ্ট—এই সংঘর্ষ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বছরের পর বছর অবহেলা, দখলদারিত্ব, রেকর্ড জটিলতা এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার ফলই আজকের রক্তাক্ত বাস্তবতা।এখন সময় এসেছে দায়সারা তদন্ত নয়, বরং সত্য উদঘাটনের। কারণ চর বিনোদনপুরের মানুষ জানতে চায়—এই রক্তের দায় কার?


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন