সত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে কৃত্রিম অলংকারের প্রয়োজন হয় না। সত্য নিজের শক্তিতেই দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু সমাজে এমন একটি প্রবণতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে, যেখানে সত্যকে পরাজিত করার পরিবর্তে সত্যের বাহককে আক্রমণ করা হয়। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা গণমাধ্যম—যে-ই বাস্তবতা তুলে ধরুক না কেন, তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ, সামাজিক ও ভার্চুয়াল চাপ প্রয়োগের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। অথচ অশুভ দৃষ্টিভঙ্গি সত্যের কী-ই বা আসে যায়? সাময়িকভাবে সত্যকে আড়াল করা সম্ভব হলেও তাকে পরাজিত করা কখনো সম্ভব নয়।
সভ্যতার ইতিহাস বলে, প্রতিটি যুগেই সত্যকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থের প্রভাব কিংবা সংগঠিত অপপ্রচারের মাধ্যমে সত্যকে বিতর্কিত করার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু সময়ের নির্মম বিচারে শেষ পর্যন্ত সত্যই টিকে থেকেছে। কারণ সত্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়; এটি সমাজের সম্মিলিত বিবেকের প্রতিফলন।
আজকের সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মত প্রকাশের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি বিভ্রান্তি ছড়ানোরও সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। একটি তথ্যের সত্যতা যাচাই না করেই অসংখ্য মানুষ মন্তব্য করেন, শেয়ার করেন, বিচার করে ফেলেন। অনেক সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়, যাতে প্রকৃত ঘটনা চাপা পড়ে যায় এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ। এ ধরনের প্রবণতা শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সত্য অনুসন্ধান। একজন সাংবাদিক যখন কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরেন, তখন তার কাজের জবাব হওয়া উচিত তথ্য ও যুক্তি দিয়ে। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, প্রতিবেদনের তথ্য খণ্ডন না করে প্রতিবেদককেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হয়। কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ, কখনো সামাজিক বয়কট, কখনো ভার্চুয়াল ট্রল—এসবের মাধ্যমে মূল বিষয় থেকে জনদৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চলে। এটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অশুভ দৃষ্টিভঙ্গির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সত্যকে নয়, সুবিধাকে অনুসরণ করে। যে সত্য নিজের স্বার্থের সঙ্গে মিলে যায়, সেটিকে গ্রহণ করা হয়; আর যে সত্য স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তাকে মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। এই দ্বৈত মানদণ্ড সমাজে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির সংস্কৃতিকে দুর্বল করে। ফলে অন্যায়কারীরা উৎসাহিত হয় এবং সাধারণ মানুষ সত্য বলার সাহস হারাতে শুরু করে।
সত্যকে আড়াল করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো ভয় সৃষ্টি করা। মানুষ যেন কথা বলতে না পারে, প্রশ্ন করতে না পারে, অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, ভয় কখনো স্থায়ী হয় না। একসময় মানুষ নীরবতা ভেঙে কথা বলে, দলিল-প্রমাণ সামনে আসে, আর তখন সত্য তার স্বাভাবিক শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং দায়িত্বশীলতা একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য নির্ধারণের অন্যতম মানদণ্ড। তাই সংবাদ প্রকাশের পর যদি কোনো পক্ষের আপত্তি থাকে, তবে তার প্রতিকার হওয়া উচিত আইনি ও নৈতিক উপায়ে। পাল্টা তথ্য, ব্যাখ্যা কিংবা আইনের আশ্রয়—এসবই সভ্য সমাজের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। কিন্তু হুমকি, অপপ্রচার কিংবা ব্যক্তিগত চরিত্রহনন কখনো সত্যের বিকল্প হতে পারে না।একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে সত্য প্রকাশের অর্থ কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়। বরং জনস্বার্থে তথ্য তুলে ধরা একটি সামাজিক দায়িত্ব। ভুল হলে তা সংশোধনের সুযোগ অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানকে ব্যক্তিগত শত্রুতা হিসেবে দেখার প্রবণতা সমাজকে বিভক্ত করে এবং জবাবদিহিকে দুর্বল করে দেয়।
অশুভ দৃষ্টিভঙ্গি কখনো সরাসরি আক্রমণ করে, কখনো প্রশংসার আড়ালে বিভ্রান্তি ছড়ায়, আবার কখনো নীরবতার দেয়াল তৈরি করে। কিন্তু সত্যের একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে—এটি সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে তথ্য আজ বিতর্কিত, কাল সেটিই প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে। তাই সত্যকে সাময়িকভাবে চেপে রাখা গেলেও স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা যায় না।
আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মতভিন্নতাকে শত্রুতা হিসেবে দেখার প্রবণতা কমাতে হবে। যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে, তথ্যের জবাব তথ্য দিয়ে এবং সমালোচনার জবাব কাজের মাধ্যমে দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই সত্য অনুসন্ধান সহজ হবে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আরও শক্তিশালী হবে।
সত্যকে ভালোবাসা মানে নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস অর্জন করা। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি যত শক্তিশালী হবে, সমাজ তত বেশি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে। বিপরীতে অশুভ দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় আয়না ভাঙতে চায়, কারণ সেখানে নিজের মুখ দেখতে ভয় পায়।শেষ পর্যন্ত একটি কথাই বলা যায়—অশুভ দৃষ্টিভঙ্গি সত্যের কোনো ক্ষতি করতে পারে না, যদি সমাজ সত্যের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক শক্তি ধরে রাখে। সাময়িকভাবে মিথ্যার কোলাহল যতই প্রবল হোক, সত্যের নীরব শক্তি শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়। কারণ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে ক্ষমতা নয়, সময়; প্রভাব নয়, প্রমাণ; আর ভয় নয়, মানুষের বিবেক। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার দায়িত্ব অশুভ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে সত্য, ন্যায় ও বস্তুনিষ্ঠতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। সত্যকে আড়াল করার প্রতিটি অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, কিন্তু সত্যের পক্ষে উচ্চারিত প্রতিটি সাহসী কণ্ঠ ভবিষ্যতের জন্য একটি অধিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের ভিত্তি রচনা করে।