• বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
মাদকের আগ্রাসনে নীরবতা ভাঙার এখনই শেষ সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা :বাবুরহাট–মতলব বেড়ীবাঁধ–দাউদকান্দি সড়ক ১০.৩০ মিটার প্রশস্ত করার উদ্যোগ মেঘনার মুগার চর কে আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি মেঘনায় ডাকবাংলোর অধিগ্রহণকৃত জমি পরিদর্শনে জেলা পরিষদ প্রশাসক পুলিশ প্রশাসনে বড় রদবদল, ২১ কর্মকর্তার বদলি-পদায়ন মেঘনা থানার হত্যা চেষ্টা মামলার আসামি আদালতে প্রেরণ ঢাকা বিভাগের নতুন বিভাগীয় কমিশনার মনিরুজ্জামান মিঞা কুমিল্লার নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেলেন মিজ রোজী আক্তার অতি উৎসাহী অনুসারীর লাগাম টানার সময় এসেছে সঠিক পরিকল্পনায় ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় নতুন বাংলাদেশ

মাদকের আগ্রাসনে নীরবতা ভাঙার এখনই শেষ সময়

বিপ্লব সিকদার / ৩৫ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট—’জিরো টলারেন্স’। আইন আছে, অভিযান আছে, গ্রেপ্তারও হচ্ছে নিয়মিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এরপরও কেন দেশের বিভিন্ন জনপদের মতো কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় মাদকের বিস্তার থামছে না? কেন একই ব্যক্তি বারবার গ্রেপ্তার হওয়ার পরও আবার মাদক ব্যবসায় ফিরে আসতে পারছে? কেন সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে?সম্প্রতি মেঘনা উপজেলার কয়েকটি পৃথক ঘটনা সমাজের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। কোথাও ক্ষুব্ধ জনতা কথিত মাদক কারবারির বাড়িতে হামলা চালিয়েছে, কোথাও পুলিশের অভিযানে একটি দোকান থেকে মাদক উদ্ধারের খবর এসেছে, আবার কোথাও স্থানীয় যুবকেরা মাদক ব্যবসার অভিযোগে একজনকে আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। ঘটনাগুলোর সত্যতা ও দায় নির্ধারণের দায়িত্ব অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের। কিন্তু এসব ঘটনার সামাজিক বার্তাটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সেটি হলো—মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে।
একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব জনগণের নয়। সেই দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু যখন মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মনে করতে শুরু করে যে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে হতাশা জন্ম নেয়। এই হতাশা একসময় আইনের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়। আর আইনের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র নিজেই।
মাদক শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি একটি সামাজিক মহামারি। একটি ইয়াবা ট্যাবলেট কিংবা একটি মাদকের প্যাকেট শুধু একজন ক্রেতার জীবন ধ্বংস করে না। এটি একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, একটি প্রজন্মকে বিপথে ঠেলে দেয় এবং একটি সমাজকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। মাদকাসক্ত তরুণের হাত থেকেই জন্ম নেয় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, পারিবারিক সহিংসতা, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ অপরাধ। তাই মাদকবিরোধী লড়াইকে শুধু পুলিশের অভিযান দিয়ে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এটি হতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত যুদ্ধ।
মেঘনার মানুষের অভিযোগ—গ্রামে গ্রামে সহজেই মাদক পাওয়া যায়। যদি এই অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এত বিস্তৃত নেটওয়ার্ক কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে? মাদক ব্যবসা কখনোই একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকে সরবরাহ চক্র, অর্থের জোগান, নিরাপদ পরিবহন, তথ্য আদান-প্রদান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কোনো না কোনো ধরনের প্রভাব বা পৃষ্ঠপোষকতা। তাই শুধু মাঠপর্যায়ের খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার মূল উৎপাটন হবে না।
প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো সিন্ডিকেট ভাঙা। যারা মাদক এনে দেয়, যারা অর্থ বিনিয়োগ করে, যারা রাজনৈতিক, সামাজিক বা অন্য কোনো প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীদের রক্ষা করে—তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ একটি গাছের ডাল ছাঁটলে নতুন ডাল গজাবে, কিন্তু শিকড় উপড়ে ফেললে গাছ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শিক্ষক, ইমাম, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ। কোনো এলাকায় নতুন কেউ মাদক ব্যবসা শুরু করলে সেটি যেন দ্রুত প্রশাসনের নজরে আসে, সে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আরেকটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। অনেক সময় দেখা যায়, একজন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হন, কিছুদিন পর জামিনে মুক্ত হয়ে আবার একই ব্যবসায় ফিরে আসেন। এমন পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তোলে—তাহলে কি পুরো বিচারব্যবস্থার কোথাও দুর্বলতা রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, তদন্ত যেন নিরপেক্ষ হয় এবং শক্তিশালী প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার সম্পন্ন হয়।
তবে একটি বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাদক ব্যবসার অভিযোগ উঠলেই কাউকে দোষী ধরে নেওয়া যাবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অপরাধ প্রমাণের একমাত্র বৈধ পথ হলো আইনি প্রক্রিয়া। গণপিটুনি, ভাঙচুর কিংবা জনরোষ কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। কারণ আজ একজন প্রকৃত অপরাধী আক্রান্ত হলে সমাজ হয়তো তা সমর্থন করবে, কিন্তু আগামীকাল যদি নির্দোষ কেউ একই পরিণতির শিকার হন, তখন তার দায় কে নেবে?রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন অপরাধ দমন করা, তেমনি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রয়োজনই অনুভব করবে না।মাদকবিরোধী লড়াইয়ে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। সীমান্ত থেকে স্থানীয় বাজার পর্যন্ত নজরদারি জোরদার করতে হবে। সন্দেহভাজন রুটগুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আসক্ত ব্যক্তি শুধু অপরাধী নন, অনেক ক্ষেত্রেই তিনি চিকিৎসারও প্রয়োজনীয় একজন মানুষ।রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী—যে দলেরই হোক, যদি কোনো ব্যক্তি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে একই আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনের প্রয়োগে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকলে জনআস্থা ফিরবে না।মাদকবিরোধী অভিযানের সফলতা শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। প্রকৃত সফলতা তখনই আসবে, যখন কোনো এলাকায় মানুষ বলতে পারবে এখানে আর মাদক পাওয়া যায় না; আমাদের সন্তানরা নিরাপদ।
মেঘনার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই কেবল একটি উপজেলার খবর নয়। এটি গোটা দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। জনগণের ক্ষোভকে আইনভঙ্গের পথে নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। যারা মাদক ব্যবসা করে, যারা এই ব্যবসার পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং যারা নীরব থেকে অপরাধকে টিকিয়ে রাখে সবার বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার দায়িত্ব শুধু পুলিশের নয়, শুধু সরকারেরও নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক—সবার যৌথ দায়িত্ব। তবে নেতৃত্ব দিতে হবে রাষ্ট্রকেই। দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক পদক্ষেপের মাধ্যমে মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে যে আইনের শাসন এখনো কার্যকর, অপরাধীর কোনো পরিচয় নেই এবং মাদকের বিরুদ্ধে ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ কেবল স্লোগান নয়, বাস্তব নীতিও বটে।আজ সময় এসেছে মাদকের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযান নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার। কারণ একটি প্রজন্মকে বাঁচাতে পারলে তবেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিরাপদ হবে।

 

লেখক, সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন