বাংলাদেশ থেকে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মানবপাচারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চাকরির বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিচিতজন কিংবা এনজিও কর্মীর পরিচয়ের আড়ালে সক্রিয় দালালচক্র সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও বেকারত্বকে পুঁজি করে প্রতারণার জাল বিস্তার করছে। সম্প্রতি সিআইডির হাতে এক মানবপাচার চক্রের মূলহোতা গ্রেপ্তারের ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে এই ভয়াবহ বাস্তবতা।
সিআইডির মানবপাচার শাখার তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ায় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীকে বিদেশে পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও অর্থ কেড়ে নেওয়া হয় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জোরপূর্বক কাজ করানোর পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় তিনি দেশে ফিরে এসে মামলা করলে তদন্তের একপর্যায়ে চক্রের কথিত মূলহোতা মো. রুবেলকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই ধরনের চক্র সাধারণত আর্থিক সংকটে থাকা নারী-পুরুষদের লক্ষ্যবস্তু করে। প্রথমে বিদেশে মাসে লাখ টাকার চাকরি, বিনা অভিজ্ঞতায় নিয়োগ এবং দ্রুত ভিসার আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর পাসপোর্ট সংগ্রহ, ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা এবং বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। বিদেশে পৌঁছানোর পর অনেকের কাছ থেকে পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে তাদের কার্যত জিম্মি করে ফেলা হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও লাওসের কিছু এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র বিদেশিদের দিয়ে অনলাইন প্রতারণা, সাইবার জালিয়াতি এবং অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ড করিয়ে থাকে। এসব কাজে অস্বীকৃতি জানালে অনেককে নির্যাতন করা হয়, এমনকি বিক্রি করে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এ ধরনের অপরাধচক্রের অস্তিত্ব উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দালালরা অনেক সময় নিজেদের বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধি, এনজিও কর্মী বা বিদেশফেরত সফল ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেয়। এতে সাধারণ মানুষ সহজেই তাদের কথায় বিশ্বাস করে। বিদেশে পাঠানোর আগে অনেকের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা আদায় করা হলেও কোনো বৈধ কর্মচুক্তি বা সরকারি অনুমোদনের কাগজপত্র দেখানো হয় না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মানবপাচার চক্র এখন আগের তুলনায় আরও কৌশলী। তারা একাধিক ব্যক্তি ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন করে এবং দেশে-বিদেশে সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করে। ফলে পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনতে সময় লাগে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান, ভিসা, কর্মচুক্তি এবং রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা অবশ্যই সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন বা পরিচিত কারও কথার ওপর নির্ভর করে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।সিআইডি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির জবানবন্দি ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে মানবপাচার নেটওয়ার্ক, আর্থিক লেনদেন এবং বিদেশে অবস্থানরত সম্ভাব্য অন্যান্য ভুক্তভোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি সহযোগীদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবপাচার রোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বৈধ অভিবাসন সম্পর্কে প্রচার এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় উচ্চ বেতনের চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে আরও অনেক মানুষ প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।