• শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
বর্ষার জলে চলনবিলে ডিঙি নৌকার নবজাগরণ পীরগঞ্জে খাল খনন প্রকল্পের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারী কোষাগারে ফেরৎ সাতক্ষীরা ফিংড়িতে আট দলীয় ক্যারাম প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত রাজশাহী মহানগর ছাত্রদলের ১৪ নেতাকে শোকজ ২৭ জুলাই আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৫৩ বিজিবির অভিযানে ১৫৭ বোতল ভারতীয় এস্কাফ সিরাপ জব্দ সাদুল্লাপুরে বকেয়া বেতন আত্মসাতের অভিযোগে উদ্যোগ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালকের বিরুদ্ধে থানায় পৃথক দুই অভিযোগ মেঘনায় জামায়াত নেতাদের অভিযোগের জবাব দিলেন আমীর এআইয়ের সুফল পেতে দায়িত্বশীল ব্যবহার জরুরি: তথ্যমন্ত্রী পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত: রিজভী

বর্ষার জলে চলনবিলে ডিঙি নৌকার নবজাগরণ

নিজস্ব সংবাদ দাতা / ৩ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টার:

বর্ষা যেন আবারও ফিরিয়ে এনেছে চলনবিলের চিরচেনা জলজ জীবন। টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে দেশের বৃহত্তম বিলাঞ্চল চলনবিল এখন পানিতে টইটম্বুর। নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় বহু গ্রামের সড়কপথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষের যাতায়াত, মাছ ধরা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে আবারও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে কাঠের ডিঙি নৌকা। আর এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে নাটোরের গুরুদাসপুরসহ চলনবিল-সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় নৌকা তৈরির কারখানাগুলোতে ফিরেছে ব্যস্ততা।

একসময় বিস্তীর্ণ জলরাশির জন্য খ্যাত চলনবিল ধীরে ধীরে দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত বসতি, বিলের বুক চিরে সড়ক নির্মাণ এবং নাব্যতা সংকটের কারণে তার অনেক ঐতিহ্য হারিয়েছে। তবুও বর্ষা এলেই প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অনেক গ্রাম। তখন আধুনিক যানবাহনের পরিবর্তে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী ডিঙি নৌকাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন।

চলতি মৌসুমে নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ এবং পাবনার চাটমোহর অঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় পুরোদমে তৈরি হচ্ছে ডিঙি নৌকা। তবে চলনবিল অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ নৌকা উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত গুরুদাসপুর। এখানে প্রায় ১৫ থেকে ১৮টি কারখানায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতুড়ি, করাত ও প্লেন মেশিনের শব্দে মুখর থাকে পরিবেশ।

সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও কাঠ কাটা হচ্ছে, কোথাও নৌকার কাঠামো জোড়া লাগানো হচ্ছে, আবার কোথাও দক্ষ কারিগররা নৌকার তলা মসৃণ করছেন। শিমুল, ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, কাঁঠাল, আম, বট ও নিমগাছের কাঠ দিয়ে তৈরি নৌকাগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য। ক্রেতারা কাঠের গুণগত মান, আকার ও কারিগরি দেখে পছন্দের নৌকা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। সাধারণ ডিঙি নৌকার দাম ৩ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং উন্নতমানের প্লেনসিটযুক্ত নৌকার দাম ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা।

কারখানা মালিক ইয়ারুল, শামীম, জাহাঙ্গীর হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাক জানান, কাঁচামালের মূল্য এবং শ্রমিকের মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবুও বর্ষা মৌসুমের চাহিদা পূরণে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন তাঁরা।

কারিগর আফজল ও শরীফ বলেন, গত বছর পানির অভাবে নৌকার বিক্রি আশানুরূপ হয়নি। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিদিন দুটি পর্যন্ত নৌকা তৈরি করতে হচ্ছে। প্রতিটি নৌকা তৈরির জন্য তাঁরা প্রায় এক হাজার টাকা মজুরি পান।

অন্যদিকে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা জেলে ও ক্রেতারা জানান, বর্ষা মৌসুম তাঁদের জীবিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কৃষিকাজ কমে যাওয়ায় এ সময়ে মাছ ধরার ওপরই নির্ভর করেন তাঁরা। নতুন পানিতে মাছ ধরতে এবং বিলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করতে নতুন ডিঙি নৌকার বিকল্প নেই। তাই মৌসুমের শুরুতেই প্রয়োজনীয় নৌকা কিনতে তাঁরা গুরুদাসপুরের বাজারে ভিড় করছেন।

গুরুদাসপুর উপজেলা ফার্নিচার পট্টি মালিক সমিতির সভাপতি শামীম বলেন, চলনবিল অঞ্চলে তৈরি ডিঙি নৌকার সুনাম বহুদিনের। প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার চাঁচকৈড় হাটে বসা নৌকার বাজারে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা আসেন। তুলনামূলক কম দামে মানসম্মত নৌকা পাওয়ায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই এ বাজারে জমে ওঠে বেচাকেনা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চলনবিলের জলজ সংস্কৃতি শুধু একটি অঞ্চলের ঐতিহ্য নয়, এটি বাংলাদেশের লোকজ জীবনধারা ও পরিবেশ-অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বিলের স্বাভাবিক নাব্যতা রক্ষা, দখল ও দূষণ প্রতিরোধ এবং জলাভূমি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় বর্ষায় ডিঙি নৌকার এই ঐতিহ্য হয়তো একসময় শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

বর্ষার জলে যখন চলনবিল আবারও জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তখন ডিঙি নৌকা শুধু একটি বাহন নয়—এটি হাজারো মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জলজ জনপদের প্রাণস্পন্দনের প্রতীক। গুরুদাসপুরের ব্যস্ত কারিগরদের হাতেই সেই শতবর্ষের ঐতিহ্য নতুন করে রূপ নিচ্ছে, যা বর্ষা এলেই চলনবিলের মানুষকে আবারও ফিরিয়ে নিয়ে যায় তাদের চিরচেনা জলময় জীবনে।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন