সুন্দরবন রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরে সুরক্ষা দিয়ে আসছে সুন্দরবন। অথচ এই বনাঞ্চলের ক্ষতিও করছে এ অঞ্চলেরই এক শ্রেণির মানুষ। তাই কোনো ধরনের পক্ষপাত ছাড়াই সুন্দরবন সংরক্ষণে সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
শনিবার দুপুরে মোংলা উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য সুন্দরবন ও উপকূলীয় জীবিকার সুরক্ষা’ শীর্ষক দিনব্যাপী নাগরিক সংলাপের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), ব্রাইটার্স, পশুর রিভার ওয়াটারকিপার, সচেতন ফাউন্ডেশন এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ‘পিউপিল ম্যান্ডেট: ম্যানিফেস্টো টু অ্যাকশন’ সিরিজের অংশ হিসেবে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
সুন্দরবন সংরক্ষণ, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক নীতি, পরিকল্পনা ও করণীয় নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অংশীজনদের অংশগ্রহণে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকার পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে বিশ্বাসী। প্রধানমন্ত্রীও সবুজ ও পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেন। পাহাড় কাটা ও নির্বিচারে গাছ নিধনের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের কল্যাণে সরকার প্রথমবারের মতো উপকূলীয় ৮ হাজার ২৭১টি জেলে পরিবারের জন্য ৬৬১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে, যা তাদের জীবিকা সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরিবেশ দূষণ কমাতে দেশের কোনো ইটভাটায় কাঠ পোড়াতে দেওয়া হবে না।
পাশাপাশি নতুন করে আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে না। ভবিষ্যতে সৌর ও বায়ুশক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া পরিবেশ দূষণ কমাতে ঢাকায় ২০ থেকে ২৫ বছর পুরোনো বাস পর্যায়ক্রমে সড়ক থেকে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুন্দরবন বাংলাদেশের ফুসফুস। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এবং দেশের পরিবেশ রক্ষায় এই বনকে সুরক্ষিত রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।
সংলাপের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়কারী শরীফ জামিল। উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন খুলনা-১ আসনের এমপি আমীর এজাজ খান, বাগেরহাট-৪ আসনের এমপি মো. আব্দুল আলীম, বাগেরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন, খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার সুমী, মোংলা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. রেফাতুল ইসলাম, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেত্রী মনিরা শারমিন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান হাওলাদার, পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চ খুলনার সাধারণ সম্পাদক সুতপা বেদজ্ঞ ও সুন্দরবন জাদুঘরের পরিচালক সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস।
উদ্বোধনী অধিবেশনে রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলা বিষয়ক প্রতিশ্রুতি নিয়ে বক্তৃতা করেন রিভার বাংলার সম্পাদক ও ধরার কেন্দ্রীয় নেতা ফয়সাল আহমেদ। উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য দেন সচেতন ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও ধরার হাবিবুর রহমান। উদ্বোধনী অধিবেশনের সংলাপ সঞ্চালনায় ছিলেন পশুর রিভার ওয়াটারকিপার ও সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’র সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ।
দুপুরের বিশেষ অধিবেশনে ‘দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জীবন-জীবিকা ও বাস্তুতন্ত্র’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। বিশেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মোংলা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক কে এম রব্বানী। বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, পূর্ব সুন্দরবন বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী, উপকূলীয় সাংবাদিকতার প্রবর্তক গবেষক রফিকুল ইসলাম মন্টু, ব্রাইটার্স ফাউন্ডেশনের সভাপতি ফারিহা অমি ও সাইদুর রহমান সিয়াম।
এ ছাড়া বিশেষ অধিবেশনে বক্তৃতা করেন জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ হাওলাদার, ডলফিন সংরক্ষণ দলের নেতা ইস্রাফিল বয়াতি, ধরার নেত্রী কমলা সরকার, ইয়ুথ লিডার ডলার মোল্লা, শাহীন খলিফা ও আরাফাত দূর্জয়।
বিশেষ অধিবেশন সঞ্চালনায় ছিলেন ধরা বরগুনার সদস্যসচিব মুশফিক আরিফ। দিনব্যাপী সংলাপের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে বক্তৃতা করেন ধরার কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব ও পরিবেশযোদ্ধা শরীফ জামিল।