রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন নানা আলোচনা চলছে, তখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই আলোচনায় উঠে এসেছে। দলের অভ্যন্তরীণ সিনিয়রিটি, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, শিক্ষাবিদ হিসেবে পরিচিতি এবং মুক্তিযুদ্ধের অবদানের কারণে তাঁকে নিয়ে বিএনপির একটি অংশে ইতিবাচক মতামত প্রকাশ পাচ্ছে। যদিও দল আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি, তবুও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল, বিশ্লেষক ও সমর্থকদের আলোচনায় তাঁর নাম অন্যতম হিসেবে উঠে আসছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দলটির সঙ্গে যুক্ত। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন এবং বর্তমানে স্থায়ী কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন সংকটময় সময়ে তিনি দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম এবং কারাবাসের সময়েও তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকেও তিনি দেশের রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে অধ্যাপনা এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গবেষক ও লেখক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে একজন শিক্ষাবিদ ও অভিজ্ঞ প্রশাসকের উপস্থিতি রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়াকে তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয়।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা) আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদের প্রবীণ সদস্য হিসেবে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি তাঁর দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতারও স্বীকৃতি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে বিভিন্ন মহলের মতামতও আলোচনায় এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম তাঁর এক মতামতে উল্লেখ করেন, অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় আনুগত্য, বিশ্বস্ততা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত এবং সেই বিবেচনায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখা যেতে পারে। একইভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শামছুল আলম সেলিমও তাঁর মতামতে অভিজ্ঞ, গ্রহণযোগ্য ও আনুগত্যশীল ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পক্ষে মত দেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আরেকটি অংশ মনে করেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদ সদস্যদের ভোটে সম্পন্ন হয় এবং কোনো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনা বা জনমতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয় না। ফলে শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও সংসদীয় বাস্তবতার ওপর নির্ভর করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, শিক্ষাবিদ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন স্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে আলোচনায় রাখছে। তবে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি। তাই বিষয়টি এখনও রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
এদিকে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মতামতধর্মী লেখা এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিবন্ধে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পক্ষে মত প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে দলের অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের নামও আলোচনায় রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিএনপির চূড়ান্ত অবস্থান প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে এ আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।