• শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩৯ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
৫নং কাইচাইল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা বিএনপি নেতা খায়রুজ্জামান মিয়ার ভারতে নেওয়ার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে টিএফআই সেলে রাখা হয়েছিল: চিফ প্রসিকিউটর হালুয়াঘাটের দর্শারপাড়, খন্দকপাড়া, দক্ষিণ খয়রাতুরি ও রঘুনাথপুর এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রশাসনের হাতে মুকসুদপুর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি পদ হারালেন রবিউল ইসলাম বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা: সার্জিও গর বর্তমান সংসদের দিকে দেশের ৩৬ কোটি চোখ নিবদ্ধ: ভারপ্রাপ্ত স্পিকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই বলা নয়: রাষ্ট্রদূত মুশফিক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সার্জিও গর, উঠে এলো গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় রাষ্ট্রায়ত্ত সব বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার: প্রতিমন্ত্রী শরীফুল প্রতিবাদের শহীদ মিনার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে: নোবিপ্রবির তিন শিক্ষকের যাত্রা

প্রতিবাদের শহীদ মিনার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে: নোবিপ্রবির তিন শিক্ষকের যাত্রা

নিজস্ব সংবাদ দাতা / ১৫ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

ওমর ফারুক:

দুই বছর আগের সেই উত্তাল জুলাই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শহীদ মিনার প্রাঙ্গণও হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের প্রতীক। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির ঘটনার বিরুদ্ধে যখন অধিকাংশ শিক্ষক নীরব ছিলেন, তখন মাত্র তিনজন শিক্ষক প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে নিপীড়নবিরোধী সমাবেশ করেছিলেন। সময়ের পরিক্রমায় সেই তিন শিক্ষকই আজ দেশের তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন।

তাঁরা হলেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এবং অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নোবিপ্রবির শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সংহতি জানান এবং নিপীড়নের প্রতিবাদে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন।

সেই সময় আন্দোলন ঘিরে দেশে একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটছিল। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির খবর আসছিল বিভিন্ন স্থান থেকে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক কিংবা ব্যক্তিগত ঝুঁকির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এই তিন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের ভাষায়, এটি ছিল একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব পালন।

দুই বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, তাঁদের তিনজনই এখন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছেন। আন্দোলনের পর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ প্রথমে নোবিপ্রবির ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম নোবিপ্রবির উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার সম্প্রতি সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন।

সেই সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ বলেন, “ঐ সময় শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমে গিয়েছিল। একপর্যায়ে তারা সব শিক্ষকদের ই-মেইল করে তাদের সঙ্গে থাকার জন্য অনুরোধ করে। আমরাও আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এরপর তাদের ই-মেইল পেয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, আমরাও তাদের সঙ্গে গিয়ে আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করব। বিশেষ করে আমি, জাহাঙ্গীর স্যার ও শফিক স্যার আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নিই।”

তিনি আরও বলেন, “তখন আমরা কোনো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় আন্দোলনে নামিনি। আমার অনুভূতি ছিল, আমরা তো শিক্ষক। আমাদের ছাত্রদের ওপর নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যা আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল।”

তিনি বলেন, “একজন শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে থাকা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, যৌক্তিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা যখন মারা যাচ্ছে, তখন তাদের পাশে থাকা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এতে আমাদের চাকরিচ্যুত হওয়া, গ্রেপ্তার হওয়া কিংবা মেরেও ফেলতে পারত—এসব নিয়ে চিন্তা না করেই আমরা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।”

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম, যখন দেখেছি আমাদের শিক্ষার্থীদের দাবি ন্যায্য। তারা যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছিল, অথচ তাদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছিল, নির্মম নির্যাতন করা হচ্ছিল। বিশেষ করে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করার পর আমরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করি। সে সময় এই চিন্তা করিনি যে আমাদের চাকরি চলে যাবে, আমাদের ক্ষতি হবে বা এরকম কিছু ঘটতে পারে।”

তিনি জানান, “আমরা দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যৌক্তিক আন্দোলনে রাজপথে ছিলাম। আমাদের ১৯৭১ সালে জন্ম হয়নি বলে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। আমার জীবদ্দশায় ভবিষ্যতে আবার যদি কখনো দেশের জন্য দাঁড়াতে হয়, তাহলে আবারও দাঁড়াব, ইনশাআল্লাহ।”

অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার বলেন, “আমি আন্দোলন করেছি একটি বৈষম্যবিরোধী সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠুক, প্রত্যেকে যেন তার অধিকার ফিরে পায়—এই বিশ্বাস থেকে। এর জন্য আমাকে কিছু পেতেই হবে, এমন চিন্তা থেকে আন্দোলন করিনি। ছাত্রসমাজের ওপর হামলা, সারা দেশে গুম, খুন ও হত্যার প্রতিবাদে সে সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছি।”

তিনি বলেন, “আমি একটি বিষয় ধারণ করি—আজকের ছাত্রই আগামীর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এজন্য আমার দায়িত্বের জায়গা থেকে যতটুকু করার, আমি করেছি। দায়িত্ব পেয়েছি, এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া এবং সরকারকেও ধন্যবাদ। তবে দায়িত্ব পাওয়াই বড় কথা নয়, সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারাই মূল বিষয়।”

দুই বছরের ব্যবধানে নোবিপ্রবির শহীদ মিনারের সেই ছোট্ট প্রতিবাদ আজ ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে আছে। সেই সমাবেশে উপস্থিত তিন শিক্ষক এখন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের অংশ। তাঁদের এই পথচলা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং সংকটময় সময়ে নৈতিক অবস্থান, শিক্ষকের সামাজিক দায়িত্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি উপলক্ষ।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন