ঢাকা   ০২:২৮:০৩ পিএম, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোন্দলে জর্জরিত নোবিপ্রবি ছাত্রদল, এবার বহিষ্কার দুই নেতা

Reporter Name
  • Update Time : Saturday, August 8, 2026,
  • 75 Time View
  • ১৩ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

ওমর ফারুক:

দীর্ঘদিন ধরে চলা অভ্যন্তরীণ বিরোধ, প্রকাশ্য বাগ্‌বিতণ্ডা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে এবার সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) শাখা ছাত্রদলের দুই নেতাকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। বহিষ্কৃত দুই নেতা হলেন শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি শাখাওয়াত হোসেন সায়েম ও প্রচার সম্পাদক খায়রুল আমান শাওন।

গত রোববার (২ আগস্ট) ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাঁদের বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁদের সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।

তবে বিজ্ঞপ্তিতে দুই নেতার বিরুদ্ধে কী ধরনের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। বহিষ্কৃত দুই নেতা দাবি করেছেন, তাঁদের কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, সেটিও জানানো হয়নি।

দুই নেতা নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি সাব্বির হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁদের বহিষ্কারের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও নেতৃত্বের বিরোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের নেতাদের মধ্যে বিরোধের একাধিক ঘটনা এর আগে প্রকাশ্যে এসেছে। গত ২১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক উকিল হলের তৎকালীন প্রভোস্ট ড. মো. তসলিম মাহমুদের সঙ্গে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদ হাসানের বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, হলের একটি আবাসিক আসনকে কেন্দ্র করে ওই বিরোধের সূত্রপাত। পরে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে উপাচার্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন হলের প্রভোস্ট।

এর আগে গত ২৭ এপ্রিল আবদুল মালেক উকিল হলের সামনে ছাত্রদলের নেতাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শান্তিনিকেতন এলাকায় শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি সাব্বির হোসেনের সঙ্গে সংগঠনের এক নম্বর সহসভাপতি মো. আমিনুল ইসলামসহ কয়েকজনের হাতাহাতি হয়। পরে হলের সামনে আবারও দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে সাব্বির হোসেনকে চ্যাংদোলা করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাও দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

ওই ঘটনার পর সাব্বির হোসেনকে সংগঠনের পক্ষ থেকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

তবে সাব্বির হোসেনের দাবি, তিনি সাবেক উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের ডাক দেওয়ার পর থেকেই সংগঠনের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এবং একপর্যায়ে তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাতও করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

বহিষ্কৃত প্রচার সম্পাদক খায়রুল আমান শাওন বলেন, ‘ছাত্রদলের সভাপতি বর্তমানে ক্যাম্পাসের জুনিয়র ব্যাচের ১ যুগেরও বেশি সিনিয়র এবং সাধারণ সম্পাদক শিবিরের বাছাইকৃত কর্মী। তারপরও কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা তাঁদের নির্দেশ অনুযায়ী বিভিন্ন প্রোগ্রাম আয়োজন করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কমিটি দেওয়ার পর থেকেই ছাত্রদলের সভাপতি ও শিবিরের বাছাইকৃত কর্মী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সবকিছু স্বৈরাচারীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সিনিয়র সহসভাপতি সাব্বির হোসেন, সহসভাপতি শাখাওয়াত সায়েম, প্রচার সম্পাদক খায়রুল আমান শাওন ও আমাদের অনুসারীদের নিয়ে আমাদের প্ল্যাটফর্মটা দাঁড় করাচ্ছিলাম।’

শাওন আরও বলেন, ‘নোবিপ্রবি ছাত্রদল সভাপতিকে “বুড়ো খাটাশ” বলায় আমাকে বহিষ্কার করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে এটুকু সত্য যে, আমরা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কখনোই এমন কোনো কর্মকাণ্ডে একাত্ম হইনি, যা আমাদের দলীয় আদর্শ, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার পরিপন্থী। চাঁদাবাজি, প্রকৌশলীকে হুমকি-ধমকি প্রদান, শিক্ষকবৃন্দ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, অবৈধভাবে হলের সিট দখল, বৈধভাবে বরাদ্দকৃত সিট বাতিলের জন্য হল প্রভোস্টের ওপর চাপ প্রয়োগ, জনসম্মুখে কাউকে হেনস্তা করা কিংবা অন্য কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমরা কখনো তাদের সঙ্গে ছিলাম না। তাদের সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডে এক হতে না পারাই বহিষ্কারের কারণ হতে পারে।’

সহসভাপতি শাখাওয়াত হোসেন সায়েম বলেন, তাঁদের বহিষ্কারের আগে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষ্য, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, সেটাও আমরা জানি না। আমাদের কাছ থেকে কোনো কিছু জানতেও চাওয়া হয়নি। হুট করেই বহিষ্কার করা হয়েছে।’

সায়েমের দাবি, নোবিপ্রবি ছাত্রদলের কমিটিকে ‘ভুজুংভাজুং কমিটি’ বলায় তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদ হাসান বলেন, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই দুই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ছাত্রদলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক টিম তাদের দফায় দফায় সতর্ক করেছে। কমিটি দেওয়ার আট মাস হয়ে গেলেও এক দিনের জন্যও তারা কোনো দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেনি।’

জাহিদ হাসানের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠন ও কমিটিকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য করার পাশাপাশি তাঁরা সংগঠনের নীতির বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন। এসব বিষয় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক টিমের নজরে ছিল।

শোকজ না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে নোটিশের মাধ্যমে তাদের সতর্ক করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক টিম অনলাইনে এবং বিভিন্ন মিটিংয়েও তাদের সতর্ক করেছে।’

তিনি আরও বলেন, সংগঠনের সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে কেউ নন। দায়িত্ব নিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ না নিলে তাঁর বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শাখা ছাত্রদলে গ্রুপিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জাহিদ হাসান। তাঁর ভাষ্য, ‘গ্রুপিং বা অন্তর্কোন্দল—এগুলো আমাদের কোনো বিষয় নয়। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অমূলক। এখানে ছাত্রদলের যথাযথ নেতৃত্বের মাধ্যমেই সংগঠন পরিচালিত হচ্ছে।’

তাঁর দাবি, বহিষ্কৃত দুই নেতা কার অনুসারী, সেটি বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক অভিযোগের ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এর আগে কমিটি ঘোষণার প্রায় এক মাসের মধ্যে শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ আলী ও সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মেহেদী হাসান বাধনকে শোকজ করা হয়েছিল। পরে তাঁদের তিন মাসের জন্য দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে দেখা যায়নি বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের কারণ হিসেবে শুধু ‘সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের’ কথা বলা হয়েছে। অভিযোগের বিস্তারিত উল্লেখ না থাকায় এবং বহিষ্কৃত নেতাদের শোকজ করা হয়েছিল কি না, তা কেন্দ্রীয় বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি