শেরপুরের নকলায় এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনই নেমে এসেছে এক পরিবারের ওপর হৃদয় নিংড়ানো শোকের ছায়া। চার বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার হতাশা যেন মুহূর্তেই ১৭ বছরের কিশোরী দিয়ামনি অন্তির জীবনের সব আলো নিভিয়ে দিয়েছে। ফল প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে সে।
সোমবার (১০ আগস্ট) দিবাগত রাতে নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের চরবাছুরআলগী গ্রামে মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটে। দিয়ামনি ওই গ্রামের কৃষক দুলাল মিয়ার তিন মেয়ের মধ্যে সবার ছোট। সে স্থানীয় চন্দ্রকোনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দিয়ামনি চার বিষয়ে অকৃতকার্য হয়। ফলাফল জানার পর থেকেই সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। পরিবারের সদস্যরা হয়তো তখনও ভাবেননি, পরীক্ষার ফলের এই আঘাত কিশোরী মেয়েটিকে এমন ভয়াবহ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেবে।
রাতে বড় বোন শম্পার সঙ্গে নিজ শয়নকক্ষে ঘুমাতে যায় দিয়ামনি। একপর্যায়ে শম্পা ঘুমিয়ে পড়লে গভীর রাতে কক্ষ থেকে বের হয়ে পাশের বারান্দার একটি কক্ষে যায় দিয়ামনি। সেখানে কাঠের রোয়ার সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে বলে পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
রাত ৪টার পর ঘুম থেকে উঠে বিছানায় দিয়ামনিকে দেখতে না পেয়ে খুঁজতে শুরু করেন বড় বোন শম্পা। পাশের বারান্দার কক্ষে গিয়ে দিয়ামনিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তিনি। মুহূর্তেই কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো বাড়ির পরিবেশ। পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর ছোট মেয়েকে ঘিরে থাকা ভবিষ্যতের সব আশা যেন এক রাতেই নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি চন্দ্রকোনা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে জানানো হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে।
নকলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিপন চন্দ্র গোপ জানান, সোমবার দিবাগত রাত ২টা থেকে রাত ৪টা ১০ মিনিটের মধ্যে দিয়ামনি ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করে থাকতে পারে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। পরিবারের লিখিত আবেদনের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মরদেহ বিনা ময়নাতদন্তে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দিয়ামনির মৃত্যুর ঘটনায় চরবাছুরআলগী গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের আবহ। যে মেয়েটিকে ঘিরে পরিবারের ছিল নানা স্বপ্ন, সেই মেয়েটিই আজ নেই। একটি পরীক্ষার ফলাফল তার জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি হয়ে দাঁড়াল।
এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়—একটি পরীক্ষার ফল কখনোই একটি জীবনের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। ফলাফল খারাপ হলে সন্তানকে বকাঝকা নয়, তার পাশে দাঁড়ানো, কথা শোনা এবং মানসিকভাবে সাহস দেওয়া জরুরি। কারণ একটি ব্যর্থতার পরও সামনে থাকে অসংখ্য সম্ভাবনার দরজা।
দিয়ামনির চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি সমাজের জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা। পরীক্ষার ফলের চেয়ে একটি সন্তানের জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। তাই ফল প্রকাশের সময় প্রতিটি পরিবারকে সন্তানের পাশে দাঁড়াতে হবে—যেন আর কোনো দিয়ামনিকে হতাশার অন্ধকারে হারিয়ে যেতে না হয়।