• বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৫৩ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

মেঘনায় যে কারণে মাদকসহ সামাজিক বিপর্যয় ঠেকানো যাচ্ছে না

নিজস্ব সংবাদ দাতা / ৮ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লব সিকদার:

চোর সন্দেহে কাউকে আটক করা হলো। এরপর পুলিশে না দিয়ে গ্রামের লোকজন বসে ‘মীমাংসা’ করে দিলেন। মাদক সেবনের অভিযোগ উঠলেও একইভাবে সালিস বসে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রেও অভিযোগ থানায় বা প্রশাসনের কাছে যাওয়ার পর প্রভাবশালী মহলের মধ্যস্থতায় বিষয়টি আপসের দিকে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গণধোলাই, সুদের কারবার, জমি-জমা ও পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া এবং মামলা করা বা মামলা থেকে ছাড়ানোর নামে বাণিজ্যের অভিযোগ।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ থাকার পরও মেঘনায় মাদকসহ সামাজিক অপরাধ কমছে না কেন?

অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অপরাধের অনেক ঘটনা প্রথমেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে না গিয়ে স্থানীয়ভাবে ‘মীমাংসা’র চেষ্টা করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত পক্ষকে বসিয়ে টাকা-পয়সা, জরিমানা বা সামাজিকভাবে ‘শাস্তি’ দেওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি শেষ করার চেষ্টা করা হয়। এতে অপরাধের প্রকৃত চিত্র প্রশাসনের কাছে পৌঁছায় না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

তবে সব ধরনের বিরোধ স্থানীয়ভাবে মীমাংসার সুযোগ নেই। গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু বিরোধ ও মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রণীত। অর্থাৎ আইন যে ধরনের বিরোধ গ্রাম আদালতের এখতিয়ারে দিয়েছে, তার বাইরে গুরুতর অপরাধকে ব্যক্তিগত সালিসে নিষ্পত্তি করার সুযোগ নেই।

মাদকেও ‘মীমাংসা’র অভিযোগ

মেঘনায় মাদকবিরোধী অভিযান ও গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়মিতই সামনে আসছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে মাদক মামলায় সাত বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক সেবন বা মাদক কারবারের বিষয়ে সবাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য দেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিচিত বা প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। এতে একজন মাদকসেবী বা কারবারি সাময়িকভাবে রক্ষা পেলেও তার মাধ্যমে মাদকের বিস্তার বন্ধ হয় না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এ মাদকসংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। ফলে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগকে ব্যক্তিগত সালিসে নিষ্পত্তি করার প্রবণতা আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

বাল্যবিয়ের ঘটনায়ও একই প্রশ্ন

গত জুলাইয়ে মেঘনায় সপ্তম শ্রেণির ১৩ বছর বয়সী এক ছাত্রীর বাল্যবিয়ে আয়োজন বন্ধ করে উপজেলা প্রশাসন। ওই ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত কনের মাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

এ ঘটনা দেখায়, প্রশাসনের কাছে তথ্য পৌঁছালে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে অনেক বিয়ের আয়োজন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোপন রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কোথাও খবর প্রকাশ পাওয়ার পরও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিষয়টি ‘পারিবারিক ব্যাপার’ হিসেবে দেখিয়ে আপসের চেষ্টা করেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

আইন নিজের হাতে নেওয়ার প্রবণতা

মেঘনায় আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে চোর বা অপরাধী সন্দেহে কাউকে ধরে মারধর কিংবা গণধোলাই দেওয়ার প্রবণতা। স্থানীয়দের অভিযোগ, কখনো কখনো কাউকে চোর বা মাদকসেবী সন্দেহ হলেই তাকে ধরে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। পরে পুলিশে দেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলে।

অভিযোগ সত্য হলেও এ ধরনের ব্যবস্থা আইনের বিকল্প হতে পারে না। আবার অভিযোগ মিথ্যা হলে নিরপরাধ ব্যক্তিও শারীরিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

এ ধরনের প্রবণতা একদিকে আইনের প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতার বাইরে থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

মামলা করা ও ছাড়ানোর নামে বাণিজ্যের অভিযোগ

স্থানীয় পর্যায়ে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো—মামলায় আসামি করা, আসামি না করা কিংবা মামলা থেকে কাউকে ‘ছাড়িয়ে নেওয়া’র নামে অর্থ লেনদেনের চেষ্টা। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট মামলা, এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন, গ্রেপ্তার ও আদালতে চালান দেওয়ার তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তবে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া অর্থ লেনদেনের অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রকাশ করা সমীচীন নয়। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া এবং নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।

দায়িত্বশীলদের ‘টপ টু বটম’ অসংগতি?

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, সামাজিক অপরাধ মোকাবিলায় শুধু পুলিশ বা প্রশাসন নয়—জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু দায়িত্বশীলদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে অপরাধ প্রতিরোধের উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়ে।

মেঘনা উপজেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ হটলাইন ০১৯০৮৮৮৮৮৮৮ এবং লিগ্যাল এইড হেল্পলাইন ১৬৪৩০সহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তা নম্বর দেওয়া আছে।

অর্থাৎ অভিযোগ জানানোর আনুষ্ঠানিক পথ রয়েছে। প্রশ্ন হলো, মানুষ সেই পথ কতটা ব্যবহার করছে এবং অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

কোথায় সমস্যা?

স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি বিষয় অনুসন্ধানের দাবি রাখে—অপরাধের অভিযোগ পাওয়ার পর কতটি ঘটনা থানায় নথিভুক্ত হয়েছে, কতটি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা হয়েছে, কতটি মামলায় আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে, কতজন আদালতে পাঠানো হয়েছে, কতজন জামিন পেয়েছেন এবং কোন মামলায় চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে।

একইভাবে গত এক বছরে মেঘনায় মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা, মাদক মামলার সংখ্যা, আদালতে পাঠানো আসামির সংখ্যা এবং সাজা হয়েছে এমন মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করলেও পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

মীমাংসা নয়, আইনের প্রয়োগ

সামাজিক বিরোধ মীমাংসা করা আর ফৌজদারি অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া এক বিষয় নয়। আইন যে বিরোধ মীমাংসার সুযোগ দিয়েছে, তা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় করা যেতে পারে। কিন্তু মাদক, বাল্যবিবাহ, সহিংসতা বা অন্য কোনো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ‘গ্রামে বসে মীমাংসা’ অপরাধ প্রতিরোধের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।

মেঘনায় সামাজিক বিপর্যয় ঠেকাতে তাই প্রয়োজন শুধু অভিযান নয়—অভিযোগ গ্রহণে স্বচ্ছতা, তদন্তে নিরপেক্ষতা, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বন্ধ করা, স্থানীয় সালিসের নামে অপরাধ চাপা না দেওয়া এবং মামলা পরিচালনার প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অভিযোগকারী, অভিযুক্ত, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি—কারও জন্য আলাদা আইন নয়।

আইনের প্রয়োগ যদি ব্যক্তি ও পরিচয়ের ভিত্তিতে বদলে যায়, তাহলে মাদকবিরোধী অভিযান যতই চলুক, সামাজিক অপরাধের মূল শিকড় উপড়ে ফেলা কঠিন হবে।

মেঘনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই—অপরাধ কমাতে অভিযান হচ্ছে, কিন্তু অপরাধের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণগুলো কি সত্যিই খতিয়ে দেখা হচ্ছে?


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন