ঢাকা   ০৩:০৫:৩৬ পিএম, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দখল মুক্ত হতে চায় মেঘনা – কাঠালিয়া নদী!

Reporter Name
  • Update Time : Saturday, September 19, 2026,
  • 7 Time View

বিপ্লব সিকদার :
একসময় স্রোতস্বিনী মেঘনা-কাঠালিয়া নদী ছিল স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। নদীর বুকে চলত নৌকা, জেলেদের জালে উঠত নানা প্রজাতির দেশি মাছ। নদীপাড়ের কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গেও নদীটির ছিল নিবিড় সম্পর্ক। সময়ের সঙ্গে সেই নদীই এখন নানা ধরনের দখল, অবৈধ স্থাপনা ও মাছ শিকারের কথিত ‘ঝোপে’ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। স্থানীয়দের ভাষায়, নদীটি এখন যেন দখলমুক্ত হওয়ার জন্যই অপেক্ষা করছে।
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীর বুকজুড়ে বাঁশ, গাছের ডালপালা, জাল ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য ঝোপ। স্থানীয় জেলে ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে নদীর বিভিন্ন অংশে এভাবে ঝোপ বসিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও এসব ঝোপ দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীভাবে রেখে দেওয়া হয়। ফলে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ, মাছের চলাচল এবং সাধারণ জেলেদের অবাধে মাছ ধরার সুযোগ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর মেঘনা-কাঠালিয়া নদীর বিভিন্ন অংশে বিপুলসংখ্যক ঝোপ স্থাপন করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা প্রায় দুই হাজার পর্যন্ত হতে পারে। তবে এ সংখ্যার সরকারি কোনো সমন্বিত হিসাব পাওয়া যায়নি। সরেজমিন জরিপ করে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকেরা।
জেলেদের অভিযোগ, নদীতে ঝোপ বসানোর কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত মৎস্যজীবীরা। যাদের জীবিকা নদীর ওপর নির্ভরশীল, তারা অনেক সময় ঝোপের আশপাশে জাল ফেলতে পারেন না। কোথাও কোথাও ঝোপের নিয়ন্ত্রণকারীদের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোর আশঙ্কায় সাধারণ জেলেরা ওই এলাকা এড়িয়ে চলেন। ফলে নদী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে কিছু অংশ নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, ঝোপ স্থাপনের সঙ্গে সমাজের প্রভাবশালী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের একটি অংশ জড়িত। তাদের দাবি, পেশাদার জেলেদের পাশাপাশি অনেক ব্যক্তি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ঝোপ স্থাপন করে মাছ আহরণ করছেন। এভাবে নদীর একটি অংশকে কার্যত ব্যক্তিগত মাছ আহরণের এলাকায় পরিণত করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ঝোপ উচ্ছেদে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি স্থানীয় প্রশাসনের কিছু ব্যক্তিকে ‘ম্যানেজ’ করে এই কার্যক্রম চালানোর অভিযোগও রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে তা সত্য হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে প্রশাসনের নথি, অভিযানসংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
নদীতে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠলেও বিষয়টি দীর্ঘদিনের। এর আগেও কুমিল্লার বিভিন্ন নদীতে ঝোপ তৈরি করে মাছ শিকারের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হলেও কিছুদিন পর আবারও একই স্থানে নতুন ঝোপ তৈরি করা হয়। এতে স্থায়ী সমাধান না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মৎস্যসম্পদ রক্ষার পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌযান চলাচলও গুরুত্বপূর্ণ। নদীর মধ্যে অতিরিক্ত ঝোপ তৈরি হলে পানির স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ছোট নৌযান চলাচলেও সমস্যা হতে পারে। একই সঙ্গে এসব কাঠামোর মধ্যে ছোট মাছ ও পোনা আটকা পড়ার ফলে স্থানীয় মৎস্যসম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন জেলেরা।
সচেতন মহলের মতে, শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রথমে মেঘনা-কাঠালিয়া নদীর একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ প্রয়োজন। নদীর কোন অংশে কতটি ঝোপ রয়েছে, কে বা কারা সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন, কীভাবে মাছ আহরণ করা হচ্ছে এবং ঝোপ স্থাপনের কারণে সাধারণ জেলেদের কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে—এসব তথ্য নথিভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি গত কয়েক বছরে প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের পরিচালিত অভিযান, মামলা, জরিমানা ও উচ্ছেদের তথ্যও প্রকাশ করা দরকার।
প্রকৃত জেলেদের জন্য নদীতে মাছ ধরার সুযোগ নিশ্চিত করা, অবৈধ প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং মৎস্যসম্পদের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নদীকে ঘিরে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের দাবি—নদী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়; এটি সবার সম্পদ।
মেঘনা-কাঠালিয়া নদীর দিকে তাকালে তাই স্থানীয়দের একটাই প্রশ্ন—নদীর বুক থেকে ঝোপ সরবে কবে, বন্ধ হবে কথিত দখল আর ফিরবে কি সেই পুরোনো নদী? জেলেরা চান, নদী আবার উন্মুক্ত হোক। নৌযান চলুক নির্বিঘ্নে। মাছের বিচরণক্ষেত্র ফিরে পাক তার স্বাভাবিক পরিবেশ। আর নদীর সম্পদ ব্যবহারের অধিকার যেন কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে।
মেঘনা-কাঠালিয়া নদীকে দখল ও প্রতিবন্ধকতামুক্ত করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নদীনির্ভর মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদী বাঁচলে বাঁচবে জেলে, কৃষক, নৌযানচালক ও নদীপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা। তাই এখন সময় নদীর দিকে ফিরে তাকানোর নদীকে তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি