সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ইউনিয়নের কাজলা-কাশিবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী ও কাশিবাটি গ্রামের এনামুল হকের কন্যা ফারজানা সুলতানা হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন ঝালমুড়ি বিক্রেতা সুমাইয়াকে বিক্ষুব্ধ উত্তেজিত জনতা মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
রবিবার (২৭ জুলাই) নিহতের পিতা শেখ আব্দুল লতিফ বাদী হয়ে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে এ মামলা দায়ের করেন। সাতক্ষীরার আমলি আদালত-২-এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক মেহেদী হাসান এ ঘটনায় কোনো থানায় কোনো অপমৃত্যু বা হত্যা মামলা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে আদালতকে অবহিত করার জন্য কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।
মামলার বাদী শেখ আব্দুল লতিফ কালিগঞ্জ উপজেলার কাশিবাটি গ্রামের কলুইমেদে এলাকার শেখ ফজর আলীর পুত্র ও একটি ঘেরের পাহারাদার।
মামলার আসামিরা হলেন—কাশিবাটি গ্রামের এন্তোফা মোড়লের ছেলে হামিদুল মোড়ল, একই গ্রামের আব্দুল গফফার খানের ছেলে হুসাইন খান, রাজু আহমেদের ছেলে রাফি ইসলাম, রমজান আলী খানের ছেলে রেজাউল ইসলাম খান, রফিকুল ইসলাম খানের ছেলে নাজিম খান, ইমান আলীর ছেলে সাদ্দাম হোসেন, নিহত সুমাইয়ার ভাসুরের ছেলে হাফিজুল ইসলাম সরদারের ছেলে তৌফিক হোসেন এবং নওয়াপাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে শামীম হোসেনসহ অজ্ঞাতনামা ১২ জন।
শেখ আব্দুল লতিফ হত্যাকারীদের নাম উল্লেখ করে রবিবার আদালতে মামলা করবেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় আসামিদের বাঁচাতে নিহত সুমাইয়ার স্বামী আমিরুলের ওপর প্রভাব বিস্তার করে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে শনিবার রাতেই একটি হত্যা মামলা দায়ের করে একটি প্রভাবশালী মহল—এমন অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ ও লতিফ শেখের দায়েরকৃত মামলা থেকে জানা যায়, একই গ্রামের এনামুল হকের মেয়ে ফারজানা সুলতানা স্থানীয় কাজলা-কাশিবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। ফারজানার পরিবারের সঙ্গে তার মেয়ে সুমাইয়ার পরিবারের সুসম্পর্ক ছিল।
প্রতিদিনের ন্যায় গত ২০ জুলাই সোমবার সকালে বিদ্যালয়ে যায় ফারজানা। দুপুর ১টার পর টিফিনের সময় প্রতিদিনের মতো সে বাড়িতে না আসায় তার অভিভাবকেরা বিদ্যালয়ে গিয়ে খোঁজ নেন। সেখানে তাকে না পেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। পরে মাইকিংসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখোঁজের বিষয়টি বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা হয়।
খবর পেয়ে বিকেল ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে। এ সময় পুলিশ ও ফারজানার স্বজনরা মুঠোফোনে সুমাইয়াকে বিষয়টি অবহিত করে তাকে বাড়ি ফিরতে বলেন। দাওয়াত থেকে ভূমিহীন জনপদ চিংড়িখালি শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করা সুমাইয়া তার শাশুড়ি তৌফিকা ও মা নাছিমাকে নিয়ে বিকেল ৫টার দিকে বাড়িতে চলে আসে।
খবর পেয়ে বাবা শেখ আব্দুল লতিফকে অবহিত করে তাকে নিয়ে বোনের বাড়িতে আসেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। এ সময় পুলিশ ও স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদে ফারজানা সম্পর্কে কোনো তথ্য জানেন না মর্মে জানালে তাকে চড়-থাপ্পড় মারা হয়। ওই সময় পুলিশ তাকে নিজ জিম্মায় নেয়।
উক্ত সময়ে আসামিরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপস্থিত শত শত জনগণকে উত্তেজিত করিয়ে জোরপূর্বক বাড়িতে ঢুকে উঠানে থাকা ইট নিয়ে সুমাইয়ার দুটি বসতঘরে প্রবেশ করে। পরে লোহার রড, বাঁশের লাঠি ও ইট দিয়ে লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ঘরে থাকা দুটি খাট, দুটি আলমারি, একটি ফ্রিজ, ঘরের চাল, দেয়াল ও দরজা ভাঙচুর করে। পরে পশ্চিম পাশের ঘরের বিছানাপত্রে আগুন লাগিয়ে ৩০ হাজার টাকার মালামাল ক্ষতি করা হয়। পরে আগুন নিভিয়ে দেওয়া হয়।
মাগরিবের নামাজের পর আসামিরা বাড়ির বৈদ্যুতিক আলো নিভিয়ে দিয়ে সুমাইয়ার কাছ থেকে চাবি না নিয়ে পশ্চিম পাশের ঘরের তালা ভাঙে। ঘরের মধ্যে তখন ফারজানার সন্ধান মেলেনি।
রাত সোয়া ৭টার দিকে আবারও বাড়ির আলো বন্ধ করে ওই ঘরের আলো নিভিয়ে তল্লাশি চালায় আসামিরা। এ সময় কোনো রকমে কাঠের জানালার পাল্লা লাগিয়ে রাখা ওই ঘরের দেয়াল আলমারির ড্রয়ারে হাত-পা বাঁধা সুমাইয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করে আসামিরা।
এরপর বারান্দায় অবস্থানকারী পুলিশের কাছ থেকে সুমাইয়াকে আসামিরা ছিনিয়ে নিয়ে চড়-থাপ্পড় মারতে মারতে উঠানে চিৎ করে ফেলে। পরে ইট ও হাতুড়ি দিয়ে মুখমণ্ডল, মাথা ও গলাসহ বিভিন্ন স্থানে থেঁতলে দেয়। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থল ছেড়ে ইন্দ্রনগর মোড়ে গিয়ে অবস্থান করে। পাশবিক নির্যাতনে সুমাইয়ার কয়েকটি দাঁত ছিটকে পড়ে যায় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ এসে সুমাইয়ার লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ সুমাইয়ার সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে পরদিন লাশ সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
সুমাইয়ার লাশ এলাকায় দাফন করতে দেওয়া হবে না মর্মে প্রভাবশালীরা হুমকি দেয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে ২২ জুলাই রাত ১১টার দিকে মর্গ থেকে সুমাইয়ার লাশ নিয়ে রাত সাড়ে ১২টার পর কলুইমেদে খালপাড়ে দাফন করা হয়। মর্গ থেকে লাশ নেওয়ার সময় মৃত্যু সংক্রান্ত কাগজপত্র চাইলে থানা ও প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে নিতে হবে বলে তাদের জানানো হয়।
প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্য হামিদ মোড়লসহ কয়েকজনকে সুমাইয়া হত্যার দায় থেকে বাঁচাতে তাদের ফারজানা হত্যা মামলার সাক্ষী বানিয়ে সুমাইয়ার ভাই আল মামুনকে আসামি করা হয়—এমন অভিযোগও করা হয়েছে।
সুমাইয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে যাতে কোনো মামলা করা না হয়, সেজন্য লতিফ শেখ ও তার ভাই রবিউল শেখকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। মামলা করলেও ওই প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির কথার বাইরে কারও নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করা যাবে না—এমন কথা জানতে পেরে আব্দুল লতিফ রবিবার আদালতে মামলা করার প্রস্তুতি নেন।
বিষয়টি বুঝতে পেরে আব্দুল লতিফকে নিজ অফিসে ডেকে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে থানায় গেলে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়ে যাবে বলে জানিয়ে দেন ওই জনপ্রতিনিধি—এমন অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলায় (সিআর-৬২১/২৬, কালিগঞ্জ) আরও উল্লেখ করা হয়, ফারজানার মৃত্যু সংক্রান্ত বিষয়ে সুমাইয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে তার কোনো প্রকার সম্পৃক্ততার সত্যতা না পাওয়া সত্ত্বেও উল্লেখিত আসামিরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিকটিম সুমাইয়ার বসতঘরসহ বসতঘরে রক্ষিত উল্লেখিত জিনিসপত্র ভাঙচুর করে এবং একপর্যায়ে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়।
ফারজানার মৃত্যু সংক্রান্ত ঘটনায় সুমাইয়ার সম্পৃক্ততার সুষ্ঠু বিচারের জন্য তাকে আইনের হাতে সোপর্দ না করে আসামিরা নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মেয়ের ওপর সহিংসতার বর্ণনা দেওয়ার একপর্যায়ে সুমাইয়া ও ফারজানা হত্যার সঙ্গে জড়িতদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে কাঠগড়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েন শেখ আব্দুল লতিফ।
অপরদিকে, প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি জানতে পারেন যে লতিফ শেখ রবিবার আদালতে মামলা করবেন। এরপর কালিগঞ্জ থানার পুলিশের সঙ্গে কথা বলে তড়িঘড়ি করে নিহত সুমাইয়ার স্বামী আমিরুল ইসলামকে শনিবার সন্ধ্যায় থানায় পাঠান—এমন অভিযোগ করা হয়েছে।
লাশ দাফন নিয়ে বিপাকে পড়া, ঘর পোড়ানো ও খুনের সহিংসতার কথা না লিখে প্রকৃত ঘটনার তথ্য গোপন করে সাক্ষী ও আসামির নাম উল্লেখ না করে রাতেই একটি হত্যা মামলা (জিআর-১৬৮/২৬, কালিগঞ্জ) দায়ের করানো হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলায় আমিরুল উল্লেখ করেছেন, গত ২৯ জুন থেকে মাদারীপুরে রংমিস্ত্রির কাজ করতেন তিনি। ২০ জুলাই সকালে স্ত্রী সুমাইয়া তাকে কিস্তির টাকা পরিশোধ করার জন্য ফোন করে জানান। টাকা না দিলে তাকে হেনস্তা করা হতে পারে। তিনি এক হাজার টাকা পাঠানোর কথা বলেন। একই দিনে ফেসবুকের মাধ্যমে স্ত্রীকে হত্যা করার খবর পান। স্ত্রীকে অজ্ঞাতনামা লোকজন মারপিট করে হত্যা করেছে। ভাঙচুর করা হয়েছে ৪ লাখ টাকার মালামাল।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জজ কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোসলেমউদ্দিন বলেন, ফারজানার হত্যার বিপরীতে সুমাইয়াকে মব সৃষ্টি করে হত্যা ন্যায়বিচার ও আইনের পরিপন্থি।
কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম হাওলাদার জানান, শেখ আব্দুল লতিফকে থানায় নির্ভয়ে এসে মামলা করার ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়। এরপরও এ ধরনের স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডে নিহতের পিতাকে না পেয়ে নিহতের স্বামী আমিরুল ইসলাম বাদী হয়ে শনিবার থানায় মামলা করেন।
মামলার তদন্তভার উপপরিদর্শক মল্লিক মনিরুজ্জামানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ তদন্ত করছে।
ফারজানা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল্লাহ আল মামুনের রিমান্ড শুনানি আদালতে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই মামলা দায়েরের পর এলাকায় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারজানা হত্যা নিয়ে চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।