মনে পড়ে, তাজু যখন ভাইরাল হলো, তখন সে বারবার বলছিল, ‘আমি সাংবাদিক নই। আমি শুধু ভিডিও বানাই।’ অথচ পরে তাকে একটি অনলাইন পোর্টাল সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিল।
সরকার যখন গণমাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে, সাংবাদিকদের ন্যূনতম অনার্স পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করতে এবং ইউটিউবারদের সাংবাদিকতা থেকে আলাদা রাখতে উদ্যোগী, তখন তাজুকে সাংবাদিক বানানো হলো। এটি কেমন উদাহরণ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়েছে, তার সরলতা। সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য সমস্যা তুলে ধরা এবং সমাধানের পথ খোঁজা। তাজু যেহেতু সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে, তাই তাকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ভালো করবেন—এমন যুক্তিও দেওয়া হয়েছে।
তবে এখানেই একটি প্রশ্ন থেকে যায়—
তাহলে খাইরুল দেওয়ান কেন রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না?
টাইমস টুডের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, খাইরুলও সংস্কার চান এবং দেশ ভালোভাবে চলুক—এটাই চান। তাহলে তাকে নিয়ে কেন তামাশা করা হয়?
মনে রাখা দরকার, তাজু এখন নিজের পরিচয় সাংবাদিক হিসেবে দেবেন। এখনও গ্রামগঞ্জে কেউ সাংবাদিক পরিচয় দিলে অনেকে প্রশ্ন করেন, “বুঝলাম সাংবাদিকতা করেন, আর কী করেন?” এই সামাজিক ধারণা থেকে সাংবাদিকতা এখনও পুরোপুরি বের হতে পারেনি। সেখানে তাজুদের সাংবাদিক বানানো হলে গ্রামের মানুষ বলবে, “ও, আমাদের তাজুও তো সাংবাদিক।”
সাংবাদিকতায় লেখাপড়া করে, পেশাগতভাবে সাংবাদিকতা করেও আমরা যখন অনেক সময় নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে দ্বিধায় ভুগি, তখন তাজুরা সেই পেশার মর্যাদাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
টাইমস টুডের সম্পাদক একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রও পরিচালনা করেন, যেখানে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রেজেন্টার হিসেবে গড়ে তোলা হয় (সাংবাদিক হিসেবে নয়)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিরও একটি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই তার কাছ থেকে এমন সিদ্ধান্ত কতটা প্রত্যাশিত বা অপ্রত্যাশিত, সেটিও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
বাংলাদেশে যখন নাগরিক সাংবাদিকতার (সিটিজেন জার্নালিজম) যাত্রা শুরু হয়, তখন বিডিনিউজ ও যমুনা টিভি এ ক্ষেত্রে কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছিল। সময়ের পরিবর্তনে মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটে, যেখানে অনেক দক্ষ সাংবাদিকও তৈরি হয়েছেন। এখনও অনেক ভালো মানের মোজো (মোবাইল জার্নালিজম) সাংবাদিক রয়েছেন। কিন্তু কিছু ইউটিউবারের অপেশাদার কর্মকাণ্ডের কারণে এই ক্ষেত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাবও স্পষ্ট।
নাগরিক সাংবাদিকতা দুর্যোগ বা বিশেষ পরিস্থিতিতে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু এটি সব সময়ের জন্য পেশাদার সাংবাদিকতার বিকল্প নয়। নাগরিক সাংবাদিকতা নিজেই কোনো পেশা নয়। অথচ বাংলাদেশে এটি অনেক ক্ষেত্রে কার্ড-বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। যাকে-তাকে পরিচয়পত্র দিয়ে সাংবাদিক বানানো হচ্ছে, যা পরবর্তীতে চাঁদাবাজিসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি করছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।