ঢাকা   ০২:১০:১৬ এএম, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্যাস সংকটের মধ্যে দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং

Reporter Name
  • Update Time : Thursday, August 13, 2026,
  • 90 Time View
  • ১৬ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

বিন্দুবাংলা টিভি. কম, ডেস্ক রিপোর্টঃ

তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যেই দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কোথাও দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে, আবার কোনো কোনো এলাকায় টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দেশের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল, দুপুর কিংবা রাত—কোনো সময়ই বিদ্যুৎ বিভ্রাট থেকে রেহাই মিলছে না। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ বলেন, “সকাল, দুপুর কিংবা রাত নেই, সবসময়ই বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের দেড় ঘণ্টা থাকে না।”

মাগুরার বাসিন্দা দেবাশিষ বিশ্বাস বলেন, “গভীর রাতে ঘুমের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে যায়। কখন আসে, তার কোনো ঠিক থাকে না। বাচ্চাকাচ্চা মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বসে থাকে।”

তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতে পানি সরবরাহ, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

শিল্প খাতেও বাড়ছে সংকট

গ্যাস সংকটের পর এবার বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প খাতে। নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ রাখার খবর জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “গতকাল পর্যন্ত একটু একটু করে জ্বালানি পাচ্ছিলাম, আজ তাও বন্ধ হয়ে গেছে।”

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে সময়মতো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভ, বিদ্যুৎ অফিসে হামলা

দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

সোমবার (১০ আগস্ট) দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের এরিয়া অফিসে হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া পার্বতীপুর জোনাল অফিসের আওতাধীন ভবের বাজার ইনডোর উপকেন্দ্রেও হামলা ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে কর্মরত কর্মকর্তারা বলছেন, ধারাবাহিকভাবে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়তে থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ প্রধানকে চিঠি

এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, উপকেন্দ্র, গ্রিড ও অফিসগুলোর নিরাপত্তা চেয়ে বুধবার (১২ আগস্ট) পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন।

সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমানের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর আওতাধীন এলাকায় গড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। ফলে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে জনরোষ বাড়ছে এবং কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও অফিস হামলার শিকার হচ্ছে।

এদিকে, গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের কাছে চিঠি দিয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) কর্তৃপক্ষ। নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলার বিদ্যুৎ অফিস থেকেও নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাছে আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংকটের তিন প্রধান কারণ

বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো গ্যাসের সংকট। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ গ্যাসভিত্তিক। সম্প্রতি মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

এছাড়া দেশের কয়েকটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে বড়পুকুরিয়ার মতো বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আমদানিকারকদের কাছে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া বিল জমে থাকায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহ

বাংলাদেশে বর্তমানে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। বিপরীতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা খাতায়-কলমে প্রায় ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। তবে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির সংকটের কারণে সব কেন্দ্র একসঙ্গে চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লোডশেডিং বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়েছে। এক পর্যায়ে চাহিদার তুলনায় কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেয়।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ঢাকা জোনে ৬ হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৮৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলগুলোতেও চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে।

গ্যাস সরবরাহেও বড় ঘাটতি

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়েছে অথবা কম সক্ষমতায় চালাতে হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম মনে করেন, এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা কম।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি সংস্থান কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা

চলমান সংকট নিয়ে চাপের মুখে রয়েছে সরকার। সম্প্রতি বিদ্যুৎ পরিস্থিতির জন্য সাধারণ মানুষের কাছে দুঃখও প্রকাশ করেছেন সরকারের বিদ্যুৎ খাতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।

বুধবার (১২ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একটি কৌশল নিয়েছে এবং বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

তবে গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকট পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কতদিন সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনার কারণে এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

রাত ৮টার মধ্যে মার্কেট ও দোকান বন্ধের নির্দেশ

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দেশের সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ এবং আলোকসজ্জা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (১২ আগস্ট) রাতে বিদ্যুৎ বিভাগ এ সংক্রান্ত নির্দেশনা সারাদেশের জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠিয়েছে।

এর আগে গত ১১ জুন জারি করা নির্দেশনায় শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত ছিল। নতুন নির্দেশনায় সেই সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে রাত ৮টা করা হয়েছে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান ও অনুষ্ঠিতব্য মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও রাত ৮টার মধ্যে শেষ করতে হবে।

তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল, ওষুধের দোকানসহ জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠানগুলো এই নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে।

জনরোষ বাড়ার আশঙ্কা

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, পল্লী বিদ্যুৎসহ বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মী, স্থাপনা ও উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের সব বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাকে লোড ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো এলাকায় অতিরিক্ত এবং কোনো এলাকায় তুলনামূলক কম লোডশেডিং না হয়।

একই সঙ্গে লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষুব্ধ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিদ্যুৎ অফিসের কর্মীদের স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি বোঝানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সংকট পুরোপুরি কাটবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা ও জনরোষ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি