ঢাকা   ০৭:৩৯:২৮ পিএম, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঠাকুরগাঁও-১: আট মাসে জামায়াতের ভোট কমল কেন

Reporter Name
  • Update Time : Friday, October 30, 2026,
  • 7 Time View
  • ১২ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

বিপ্লব সিকদার : ঠাকুরগাঁও-১ আসনের রাজনীতিতে আট মাসের ব্যবধানে ভোটের হিসাবে বড় পরিবর্তন এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যে ব্যবধান ছিল প্রায় ৯৮ হাজার ভোট, ২৯ অক্টোবরের উপনির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৩৬ ভোটে। সবচেয়ে আলোচনার বিষয়, একই প্রার্থী নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জামায়াতে ইসলামীর ভোট কমেছে ৪৪ হাজারের বেশি। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তন হলেও দলটির ভোট কমেছে তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে প্রশ্ন উঠেছে, আট মাসে জামায়াতের ভোটব্যাংকে এই পরিবর্তন কেন? এটি কি ভোটার উপস্থিতির প্রভাব, সাংগঠনিক দুর্বলতা, নাকি স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তন?
ভোটের পরিসংখ্যানে কী বলছে ফলাফল
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছিলেন ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট। জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট। ব্যবধান ছিল ৯৭ হাজার ৮১৯ ভোট।
অন্যদিকে ২৯ অক্টোবরের উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন পেয়েছেন ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ ভোট। জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৪৫৩ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৩৬।
অর্থাৎ আট মাসে বিএনপির ভোট কমেছে ১১ হাজার ৪৭টি। বিপরীতে জামায়াতের ভোট কমেছে ৪৪ হাজার ৫৬৪টি। শতকরা হিসাবে বিএনপির ভোট কমেছে প্রায় ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, আর জামায়াতের কমেছে প্রায় ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ।
এ হিসাবে জামায়াতের আগের প্রাপ্ত ভোটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবার কমেছে। তবে ভোটের ব্যবধান কমেনি; বেড়েছে ৩৩ হাজার ৫১৭টি।
১. জাতীয় নির্বাচন ও উপনির্বাচনের বাস্তবতা এক নয়
ভোট কমার অন্যতম সম্ভাব্য ব্যাখ্যা নির্বাচনের ধরন ও গুরুত্বের পার্থক্য। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সাধারণত দেশব্যাপী রাজনৈতিক উত্তেজনা, দলীয় প্রচার, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি এবং সরকার গঠনের প্রশ্নে বেশি গুরুত্ব পায়। উপনির্বাচনে সেই জাতীয় আবহ থাকে না।
ফলে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহী অনেক ভোটার উপনির্বাচনে একইভাবে কেন্দ্রমুখী নাও হতে পারেন। বিশেষ করে দলীয় সমর্থকদের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে না গেলে তার প্রভাব সরাসরি প্রাপ্ত ভোটে পড়ে।
২. প্রার্থীর পরিচিতি ও ব্যক্তিগত প্রভাব
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলের তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি দীর্ঘদিনের জাতীয় রাজনৈতিক পরিচিতি ও স্থানীয় সাংগঠনিক ভিত্তির কারণে আসনটিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর ছেড়ে দেওয়া আসনে উপনির্বাচনে প্রার্থী হন ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীন। অন্যদিকে জামায়াত একই প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনকে ধরে রাখে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান হলো, বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তনের পরও দলটি আগের নির্বাচনের প্রায় ৯৫ শতাংশ ভোট ধরে রেখেছে। অন্যদিকে জামায়াত একই প্রার্থী নিয়েও আগের ভোটের প্রায় ৬৮ শতাংশ পেয়েছে।
এটি বিএনপির স্থানীয় ভোটভিত্তির ধারাবাহিকতা এবং জামায়াতের ভোট ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
৩. সাংগঠনিক ভোট ধরে রাখার প্রশ্ন
জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের পক্ষে যে পরিমাণ ভোট পড়েছিল, উপনির্বাচনে তা ধরে রাখতে না পারার বিষয়টি দলটির স্থানীয় সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নির্বাচনে শুধু সমর্থন থাকলেই হয় না, সেই সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সাংগঠনিক যোগাযোগ, ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক, নির্বাচনী এজেন্টদের সক্রিয়তা এবং ভোটের দিনের ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল, ভোটার উপস্থিতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের তথ্য ছাড়া এটিকে নিশ্চিতভাবে সাংগঠনিক ব্যর্থতা বলা যাবে না।
৪. ভোটার উপস্থিতির পরিবর্তন
উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ। মোট ভোটার ছিলেন প্রায় ৫ লাখ ১৬ হাজার। ভোট দিয়েছেন প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার।
দুটি নির্বাচনের ফলাফল তুলনা করলে দেখা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের সম্মিলিত ভোটও কমেছে। জাতীয় নির্বাচনে দুই দলের মোট ভোট ছিল ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৮৫৩। উপনির্বাচনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৪ হাজার ২৪২ (প্রদত্ত ফল অনুযায়ী)।
অর্থাৎ দুই দলের সম্মিলিত ভোট কমেছে ৫৫ হাজার ৬১১টি। এর মধ্যে জামায়াতের ভোট কমেছে ৪৪ হাজার ৫৬৪টি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জামায়াতের কমে যাওয়া ভোটের পুরোটাই বিএনপিতে স্থানান্তরিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ভোট না দেওয়া, অন্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়া কিংবা ভোটার উপস্থিতির পরিবর্তনও এর কারণ হতে পারে।
৫. ১১-দলীয় জোটের ভোটের সমীকরণ
জামায়াত ১১-দলীয় জোটের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেও জোটের সমর্থক ভোট কতটা কার্যকরভাবে একক প্রার্থীর পক্ষে এসেছে, সেটিও বিশ্লেষণের বিষয়।
জোটের রাজনৈতিক সমঝোতা থাকলেই মাঠপর্যায়ে সব দলের সমর্থক একইভাবে ভোট দেবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। স্থানীয় পর্যায়ে দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি, কর্মীদের সক্রিয়তা এবং প্রার্থীর সঙ্গে ভোটারদের সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে জোটের ভোট স্থানান্তর না হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
৬. নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ ও রাজনৈতিক বিতর্ক
উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার পর জামায়াতে ইসলামী অনিয়ম, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে বাধা এবং ব্যালট বইয়ের মুড়িতে আগাম সিল দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব অভিযোগের তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা দাবি করেছেন।
এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও প্রমাণিত ফলাফল ছাড়া এগুলোকে নির্বাচনের ফল পরিবর্তনের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। তবে অভিযোগগুলো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলই দিতে পারে প্রকৃত উত্তর
জামায়াতের ভোট কমার প্রকৃত কারণ জানতে হলে ফেব্রুয়ারি ও অক্টোবরের নির্বাচনের ১৮৫টি কেন্দ্রের ফলাফল পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোন কেন্দ্রগুলোতে জামায়াতের ভোট বেশি কমেছে, কোথায় বিএনপির ভোট প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে, কোথায় ভোটার উপস্থিতি কমেছে এবং কোন এলাকায় অন্য প্রার্থীরা বেশি ভোট পেয়েছেন—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে পরিবর্তনের ধরন স্পষ্ট হবে।
একই সঙ্গে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক ভোটার উপস্থিতি, নারী-পুরুষ ভোটারের অংশগ্রহণ, নির্বাচনী প্রচারের ধরন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি