ঢাকা   ০২:৫৯:৪৮ পিএম, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেয়ারভিত্তিক আবাসন ব্যবসা বন্ধের দাবি

Reporter Name
  • Update Time : Sunday, November 8, 2026,
  • 1 Time View
  • ১২ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

জমির শেয়ার বিক্রি করে নির্দিষ্ট আয়তনের ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে পরিচালিত অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসা বন্ধের দাবি জানিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)।

সংগঠনটির অভিযোগ, জমির মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন, নির্মাণের সক্ষমতা ও অর্থের ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করছে। এতে ক্রেতারা প্রতারণা, আর্থিক ক্ষতি ও আইনি জটিলতার ঝুঁকিতে পড়ছেন। ইতোমধ্যে এ ধরনের ব্যবসায়িক মডেলের কারণে প্রায় ৪০ হাজার নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি সংগঠনটির।

রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরেন রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল।

সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল বলেন, শেয়ারভিত্তিক আবাসন ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী দুই থেকে তিন বছরে এ-সংক্রান্ত মামলা ও আইনি জটিলতায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রিহ্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্প্রতি প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী সংবাদ প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে প্রতারণার অভিযোগে ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এসব মামলায় প্রায় ৪০ হাজার ক্রেতা এবং প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান আবাসন খাতে ক্রেতাদের সুরক্ষা এবং কার্যকর নজরদারির অভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে।

রিহ্যাবের অভিযোগ, শেয়ারভিত্তিক আবাসন ব্যবসায় জমির একটি অংশ বা শেয়ার বিক্রি করে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট আয়তনের ফ্ল্যাট নির্মাণ ও হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে জমির প্রকৃত মালিকানা, অনুমোদিত নকশা, নির্মাণের আইনগত অধিকার, অর্থের ব্যবহার এবং ফ্ল্যাটের সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে ক্রেতাদের পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয় না। ফলে অর্থ বিনিয়োগের পরও নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট পাওয়া, বৈধ মালিকানা বুঝে পাওয়া কিংবা অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না।

রিহ্যাবের মতে, এ ধরনের ব্যবসার অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো জমির শেয়ার কিনলেই নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের আইনগত মালিকানা নিশ্চিত হয় না। একই জমি বা ভবনের বিপরীতে একাধিক ব্যক্তির কাছে শেয়ার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের যথাযথ অনুমোদন, অনুমোদিত নকশা এবং নির্মাণের আইনগত অধিকার নিশ্চিত না করেই অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। দক্ষ প্রকৌশলী, স্থপতি ও পেশাদার তদারকির অভাবে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং নির্মাণমানও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সংগঠনটি আরও বলেছে, জমির মূল্য, শেয়ার বিক্রি, অর্থ সংগ্রহ ও নির্মাণ ব্যয়ের হিসাব অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নয়। এতে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), নিবন্ধন ফি এবং অন্যান্য সরকারি রাজস্ব যথাযথভাবে আদায় হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনাকারী আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে জমি কেনা, প্রকল্পের অনুমোদন, নির্মাণমান, নিরাপত্তা, কর ও ভ্যাটসহ বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে হয়। এসব শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ না করে কম দামে ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে অর্থ সংগ্রহের ফলে বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।

সংবাদ সম্মেলনে ড. আলী আফজাল দাবি করেন, এ ধরনের মডেলে নির্মাণাধীন ১০০টি ভবন পরিদর্শন করলে প্রায় প্রতিটিতেই কোনো না কোনো ধরনের অনিয়ম বা ব্যত্যয়ের অভিযোগ পাওয়া যাবে। অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের অসংগতি এবং ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার ও নির্মাণসংক্রান্ত শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। এ কারণে শেয়ারভিত্তিক প্রকল্পের ভবনগুলো সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কারিগরি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

শেয়ারভিত্তিক মালিকানায় জমির অংশীদারদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে নির্মাণকাজ, ফ্ল্যাট বরাদ্দ, দখল, দলিল নিবন্ধন ও ভবন রক্ষণাবেক্ষণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ভবিষ্যতে জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি, ব্যাংকে বন্ধক রাখা এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। এসব বিরোধ দীর্ঘমেয়াদি মামলা, আর্থিক সংকট, পারিবারিক বিরোধ ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে বলে মনে করে রিহ্যাব।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ছয় দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো- জমির শেয়ার বিক্রি করে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিনির্ভর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক মডেল বন্ধ করা অথবা কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা; জমির মালিকানা, নিবন্ধন, দায়-দেনা, অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণের আইনগত অধিকার নিশ্চিত না করে অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করা; বিদ্যমান শেয়ারভিত্তিক প্রকল্পের স্বাধীন কারিগরি ও আইনগত নিরীক্ষা করা; একই জমি একাধিকবার বিক্রি, জাল দলিল, ভুয়া অনুমোদন, অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

এছাড়া প্রতিটি প্রকল্পের জমি কেনা, অর্থ সংগ্রহ, নির্মাণ ব্যয় ও প্রকল্পের অগ্রগতির স্বচ্ছ ও নিরীক্ষা যোগ্য হিসাব নিশ্চিত করা এবং যোগ্য স্থপতি, প্রকৌশলী ও পেশাদার জনবল নিয়োগের মাধ্যমে নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে মান ও নিরাপত্তা তদারকির দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট বলেন, জমির যৌথ মালিকানা বা বৈধ বিনিয়োগের বিরুদ্ধে নন তারা । তবে অংশীদারত্ব বা যৌথ উদ্যোগের নামে এমন ব্যবসা পরিচালনা করা গ্রহণযোগ্য নয়, যেখানে বিনিয়োগের বিপরীতে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের মালিকানা ও হস্তান্তরের কার্যকর নিশ্চয়তা নেই। যেসব প্রকল্পে মালিকানা, নির্মাণের দায়, বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও চূড়ান্ত হস্তান্তরের নিশ্চয়তা নেই, সেগুলোর নতুন বিক্রয় ও অর্থ সংগ্রহ আইনগত পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখারও আহ্বান জানিয়েছে রিহ্যাব।

রিহ্যাব বলছে, আবাসন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এ খাতের সঙ্গে তিন শতাধিক সংযোগ শিল্প জড়িত। পুরো নির্মাণ খাতের অবদান মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এর সঙ্গে সম্পৃক্ত।

সংগঠনটির মতে, শেয়ারভিত্তিক অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসার সমস্যা শুধু কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের বিষয় নয়; এটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয়, আবাসনের নিরাপত্তা, সরকারি রাজস্ব ও দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ জড়িত। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর আর্থিক, সামাজিক ও আইনি ক্ষতির বোঝা রাষ্ট্রকেই বহন করতে হতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস, ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ আবু খালিদ মো. বরকত উল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ এ এফ এম ওবায়দুল্লাহ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. মো. হারুন অর রশিদ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি