ঢাকা   ১২:০৬:০৮ এএম, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোয়াইট কালার অপরাধী চক্রের কাছে জিম্মি মেঘনা উপজেলাবাসী

বিপ্লব সিকদার
  • Update Time : Tuesday, January 27, 2026,
  • 576 Time View
  • ৬ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা দেড় যুগ ধরে  এক ভয়াবহ সামাজিক ও প্রশাসনিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ হোয়াইট কালার অপরাধী চক্র ধীরে ধীরে পুরো উপজেলাকে কার্যত জিম্মি করে ফেলেছে। বালু উত্তোলন থেকে শুরু করে মাদক, মানব পাচার, সালিশ বাণিজ্য এবং ভূমি দস্যুতা—এমন কোনো অপরাধ নেই যা এই চক্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মেঘনা নদী ও আশপাশের চরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল । প্রশাসনের সামনেই  প্রভাব খাটিয়ে দিনে-রাতে চলছিল  বালু তোলা ও বিক্রি। এর ফলে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে, বসতভিটা ও ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে। প্রায় দুইশত কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, একই চক্র কৃষিজমিতে জোরপূর্বক বালু ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রি করছে, যা পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। বালু ভরাটের সিন্ডিকেট,
ভূমি দস্যুতাও এখানে একটি বড় সমস্যা। নিরীহ ও প্রান্তিক মানুষদের জমি নানা কৌশলে দখল করে নেওয়া হচ্ছে—কখনো জাল দলিল, কখনো ভয়ভীতি, আবার কখনো তথাকথিত সালিশের মাধ্যমে। স্থানীয়রা জানান, সালিশ এখন ন্যায়বিচারের মাধ্যম নয়; বরং এটি পরিণত হয়েছে একটি লাভজনক বাণিজ্যে। অর্থ ও প্রভাবশালীদের পক্ষে রায় দিতে বাধ্য করা হয় সাধারণ মানুষকে।
এদিকে মাদক ব্যবসা মেঘনা উপজেলায় ভয়ংকরভাবে বিস্তৃত হয়েছে। ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিল সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অপরাধী চক্রের ছত্রছায়ায় মাদক কারবারিরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালাচ্ছে। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ, নষ্ট হচ্ছে পরিবার ও সামাজিক বন্ধন।
টেন্ডার বাণিজ্যও এই চক্রের আয়ের অন্যতম উৎস বলে অভিযোগ। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারগুলো প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয়, বরং ভয়ভীতি ও প্রভাব খাটিয়ে ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত মান থাকে না, অপচয় হয় রাষ্ট্রীয় অর্থের। স্থানীয়রা বলেন, কাজের চেয়ে কমিশনই এখানে মুখ্য।
এছাড়া জুয়া, হুন্ডি ও মানব পাচারের মতো ভয়ংকর অপরাধও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করা হচ্ছে। বিশেষ করে মানব পাচারের ক্ষেত্রে বিদেশে কাজ দেওয়ার প্রলোভনে মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। অনেকেই সর্বস্ব হারিয়ে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ ফিরে আসছে লাশ হয়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই চক্রের বিরুদ্ধে কথা বললেই নিরীহ জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে নিপীড়নের শিকার হতে হয়। মিথ্যা মামলা, হামলা, সামাজিকভাবে হেয় করা—সবই নিত্যদিনের ঘটনা বলে অভিযোগ। ফলে ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না অনেকেই।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, প্রশাসনের একটি অংশের নীরবতা বা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতার কারণেই এই হোয়াইট কালার অপরাধী চক্র এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের আইনের আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
মেঘনা উপজেলার মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছে—রাষ্ট্র কি তাদের পাশে দাঁড়াবে, নাকি তারা আরও দীর্ঘদিন এই অপরাধী চক্রের কাছে জিম্মি হয়েই থাকবে?

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি