কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় নবম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ঘিরে অপহরণ অভিযোগের আড়ালে বেরিয়ে আসছে ভিন্ন বাস্তবতা। পরিবারের দাবি জোর করে তুলে নেওয়া হয়েছে; আর স্থানীয় অনুসন্ধান বলছে দুজনের মধ্যে আগে থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ছিল, এমনকি কোর্ট ম্যারেজের কথাও স্বীকার করেছে তারা। সালিশ, প্রশাসন ও পুলিশের বক্তব্যে অসঙ্গতি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে ঘটনাটির প্রকৃত চরিত্র নিয়ে।
অনুসন্ধানে যা উঠে এসেছে
মেঘনা উপজেলার ভাওরখোলা ইউনিয়নের আওরখোলা গ্রামে নবম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল পরিস্থিতি। গত ১৬ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের দিন সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে তাকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার অভিযোগে থানায় মামলা হলেও, ঘটনাটির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক—এমন তথ্য উঠে এসেছে স্থানীয় অনুসন্ধানে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, একই গ্রামের যুবক ইউসুফ (২৪) দীর্ঘদিন ধরে ওই ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, স্কুলে যাতায়াতের পথে অশ্লীল ইঙ্গিত ও কুপ্রস্তাব দেওয়া হতো। ঘটনার দিন সকালে ইউসুফ ও তার সহযোগীরা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যায় বলে দাবি করা হয়।
তবে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, এ ঘটনার ভিন্ন চিত্রও রয়েছে। তাদের দাবি, দুজনের মধ্যে আগে থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং অপহরণের পর তারা স্বেচ্ছায় পালিয়ে যায়। এমনকি পরে স্থানীয় পঞ্চায়েতের সামনে তারা কোর্ট ম্যারেজ করার কথাও স্বীকার করে।
ঘটনার দুই দিন পর, ১৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে একটি সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম জানান, ছেলে ও মেয়েকে উদ্ধার করে মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি।অন্যদিকে স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুল মতিনের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, সালিশে ছেলে-মেয়েকে আলাদা স্থানে রাখা হয়েছিল। তারা বিয়ের বিষয়ে অনড় থাকেন এবং বিচ্ছিন্ন করলে আত্মহত্যার হুমকি দেন। একপর্যায়ে সুযোগ পেয়ে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়।তবে এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যে মিল পাওয়া যায়নি। মেঘনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম বলেন, সালিশের বিষয়ে পুলিশকে জানানো হয়নি এবং সেখানে কোনো পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। তিনি জানান, ভুক্তভোগীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হয়েছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী আক্তার বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর তিনি ঘটনাস্থলে যান। তবে মেয়েটিকে না পাওয়ায় আইনগত প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হয়েছে।স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, এক পর্যায়ে মেয়েটিকে গ্রামে ফিরিয়ে আনা হলেও বয়স কম হওয়ায় পরিবার বিয়েতে রাজি হয়নি। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং পরে আবারও পালিয়ে যায় ওই ছাত্রী।ঘটনাটি এখন দ্বিমুখী বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একদিকে অপহরণের মামলা, অন্যদিকে স্বেচ্ছায় পালিয়ে যাওয়ার দাবি। আইনগতভাবে নাবালিকার ক্ষেত্রে সম্মতির প্রশ্নও জটিলতা তৈরি করছে।এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে এটি কি প্রকৃতপক্ষে অপহরণ, নাকি সামাজিক ও পারিবারিক অস্বীকৃতির মুখে পালিয়ে যাওয়া প্রেমের সম্পর্ক? পাশাপাশি স্থানীয় সালিশ, প্রশাসনের ভূমিকা এবং পুলিশের বক্তব্যে অসঙ্গতি ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।