• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০২:০৮ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

উন্নয়নের আলো নিভে গেলে দায় কার

বিপ্লব সিকদার / ৪০ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় কয়েক বছর ধরে উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়, উপজেলা ও গ্রামীণ সড়ক, হাট-বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে সৌরবিদ্যুৎচালিত (সোলার) স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়েছিল। প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য ছিল জননিরাপত্তা বৃদ্ধি, বিদ্যুৎবিহীন বা কম সুবিধাপ্রাপ্ত এলাকায় আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা। বিভিন্ন অর্থবছরে সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত এসব প্রকল্প স্থানীয় জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু বাস্তবতা আজ ভিন্ন। যে আলো উন্নয়নের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, তার অনেকটাই এখন অন্ধকারের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কোথাও শুধু খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু লাইট নেই। কোথাও সোলার প্যানেল উধাও। কোথাও আবার ব্যাটারি বা অন্যান্য যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। অনেক স্থানে পুরো স্থাপনাটিরই কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এসব সোলার লাইটের অধিকাংশই আজ অকেজো। ফলে যে এলাকাগুলোকে আলোকিত করার কথা ছিল, সেগুলো আবারও অন্ধকারে ডুবে গেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই অবস্থার জন্য দায়ী কে?
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে সাধারণত পরিকল্পনা, বরাদ্দ, বাস্তবায়ন, তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণের একাধিক স্তর থাকে। একটি সোলার লাইট প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, প্রকৌশলী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় তদারকি কর্তৃপক্ষের সমন্বিত দায়িত্ব থাকে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের কয়েক বছরের মধ্যেই অধিকাংশ লাইট অকেজো হয়ে গেছে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতার একটি বড় সংকেত।স্থানীয়ভাবে অনেকেই অভিযোগ করছেন, নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার, সঠিক মান নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং প্রকল্প হস্তান্তরের পর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা না থাকাই এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। যদি অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং জনগণের অর্থের অপচয় এবং দুর্নীতির একটি গুরুতর উদাহরণ।বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে প্রায়ই একটি প্রশ্ন ওঠে কাজের স্থায়িত্ব কতদিন? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, উদ্বোধনের সময় প্রকল্পটি আকর্ষণীয় হলেও কয়েক বছরের মধ্যে সেটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে উন্নয়নের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মেঘনার সোলার লাইট প্রকল্পগুলোর বর্তমান চিত্র সেই পুরোনো প্রশ্নকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে।উন্নয়নের মূল লক্ষ্য মানুষের জীবনমান উন্নত করা। কিন্তু যদি কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত অবকাঠামো কয়েক বছরের মধ্যে অচল হয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা কার্যকর? জনগণের করের টাকায় বাস্তবায়িত প্রকল্প যদি জনগণকে দীর্ঘমেয়াদে সেবা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই।বিশেষজ্ঞদের মতে, সোলার স্ট্রিট লাইট একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। যথাযথ মানের সরঞ্জাম ব্যবহার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে একটি সোলার লাইট ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে। সেখানে কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যাপক হারে অকেজো হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কী ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিল, কারা কাজ পেয়েছিল, কীভাবে বিল পরিশোধ হয়েছে এবং কাজের মান যাচাই করা হয়েছিল কিনা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা প্রয়োজন।আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের ব্যর্থতা নিয়ে কোনো মূল্যায়ন হয় না। একটি প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পর আরেকটি নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়। পুরোনো প্রকল্পের জবাবদিহি না থাকায় একই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় হয়, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না।মেঘনার জনগণ উন্নয়নবিরোধী নয়। তারা উন্নয়ন চায়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার চায়, নিরাপদ সড়ক ও আলোকিত জনপদ চায়। কিন্তু তারা এমন উন্নয়ন চায় না, যা কাগজে-কলমে থাকে অথচ বাস্তবে অদৃশ্য হয়ে যায়। তারা এমন উন্নয়নও চায় না, যেখানে উদ্বোধনের কয়েক বছর পর খুঁটি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি নিরপেক্ষ ও গভীর অনুসন্ধান পরিচালনা করা। কোন অর্থবছরে কত টাকা ব্যয়ে কতগুলো সোলার লাইট স্থাপন করা হয়েছিল, কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছিল, কাজের গুণগত মান কেমন ছিল এবং বর্তমানে কতগুলো সচল রয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে আনা উচিত। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রকল্পের তথ্য জনগণের কাছেই জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে।দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ দুর্নীতি শুধু অর্থ আত্মসাতের বিষয় নয়; এটি জনগণের অধিকার হরণেরও নাম। যে অর্থ দিয়ে একটি গ্রামের রাস্তা আলোকিত হওয়ার কথা ছিল, সেই অর্থের অপচয় মানে গ্রামের মানুষের নিরাপত্তা, চলাচল এবং জীবনমানের ক্ষতি।রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ভোগ করতে পারে। মেঘনার সোলার লাইট প্রকল্পগুলোর বর্তমান অবস্থা যদি সত্যিই অব্যবস্থাপনা, অবহেলা বা দুর্নীতির ফল হয়, তাহলে তা শুধু একটি প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়; এটি উন্নয়ন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার জন্যও হুমকি।অন্ধকার দূর করার নামে যদি কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে নতুন অন্ধকার সৃষ্টি করা হয়, তাহলে সেটি উন্নয়ন নয়, জনগণের সঙ্গে এক ধরনের নিষ্ঠুর প্রহসন। তাই এখন সময় এসেছে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের। দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে যেন এমন অপচয় ও অনিয়ম আর না ঘটে, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ উন্নয়নের আলো শুধু খুঁটির মাথায় জ্বলে উঠলেই হবে না, সেটি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার মধ্যেও জ্বলতে হবে।

লেখক, সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন