গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার কেবল রাজনৈতিক দল, নেতা কিংবা কর্মীদের জন্য নয়; সাধারণ নাগরিকের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ, তথ্য যাচাই এবং শালীনতার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। যখন স্বাধীনতা দায়িত্বহীনতার রূপ নেয়, তখন সেটি ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং গণতন্ত্র—সবকিছুর জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক অনুসারী আবেগ, দলীয় আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে এমন সব বক্তব্য প্রচার করছেন, যা শুধু রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করছে না; বরং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে বিভ্রান্তি, গুজব ও অসত্য তথ্যের জালে আটকে ফেলছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—অতি উৎসাহী অনুসারীদের লাগাম টানার সময় কি এখনই নয়?
ডিজিটাল যুগে একটি মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ একজন সাধারণ মানুষকে মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। এটি যেমন ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণেরও ক্ষেত্র তৈরি করেছে। কোনো ঘটনার প্রকৃত তথ্য যাচাই না করে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো, ভিন্নমতের মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা, অশালীন ভাষা ব্যবহার করা, এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেও অবমাননাকর মন্তব্য করা এখন অনেকের কাছে যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাস্তবে এসব আচরণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী না করে দুর্বল করে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় এসব মন্তব্য বা পোস্ট সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। তবুও সাধারণ মানুষের কাছে দলের পরিচয় বহনকারী একজন অনুসারীর বক্তব্য পুরো দলের অবস্থান হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ফলে একজন দায়িত্বহীন অনুসারীর একটি পোস্ট, একটি মন্তব্য কিংবা একটি লাইভ ভিডিও দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক দলের ইতিবাচক ভাবমূর্তিকে মুহূর্তেই প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে। রাজনীতিতে ইমেজ একটি বড় সম্পদ। সেই সম্পদ নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণহীন অতি উৎসাহ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, উত্তেজনা, বিভাজন ও প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনো দীর্ঘমেয়াদে কোনো পক্ষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি। বরং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাষ্ট্র এবং জনগণ। বর্তমান বাস্তবতায় যখন দেশ অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বহীন রাজনৈতিক আচরণ দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অনেক অনুসারী মনে করেন, নেতাকে খুশি করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রতিপক্ষকে গালি দেওয়া কিংবা আক্রমণাত্মক ভাষায় পোস্ট করা। বাস্তবে একজন বিচক্ষণ নেতা কখনোই এমন আচরণে উপকৃত হন না। কারণ নেতৃত্বের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় যুক্তি, নীতি, কর্ম এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে; অশালীন ভাষা কিংবা বিদ্বেষমূলক প্রচারণার মাধ্যমে নয়। একজন নেতার প্রকৃত অনুসারী সেই ব্যক্তি, যিনি সত্য তথ্য প্রচার করেন, শালীনতা বজায় রাখেন এবং সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় এমন কিছু ব্যক্তি সক্রিয় থাকেন, যাদের মূল উদ্দেশ্য কোনো দল বা নেতাকে সহায়তা করা নয়; বরং ইচ্ছাকৃতভাবে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। তারা কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থকের পরিচয় ব্যবহার করেন, কখনো আবার ভুয়া পরিচয়ে অপপ্রচার চালান। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের স্বার্থও হাসিলের চেষ্টা করেন। ফলে প্রকৃত কর্মী ও সাধারণ মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্ত হন।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে দায়িত্বশীল আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আবেগনির্ভর মন্তব্য নয়; বরং তথ্যভিত্তিক মতামত সমাজকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেকেই না বুঝে, না শুনে কিংবা যাচাই না করেই মন্তব্য করেন। এতে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
গণমাধ্যমের দায়িত্ব তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করা। একজন সাংবাদিককে একটি তথ্য প্রকাশের আগে একাধিক উৎস থেকে নিশ্চিত হতে হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই নিজেকে সাংবাদিক, বিশ্লেষক কিংবা রাজনৈতিক মুখপাত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন, অথচ তথ্য যাচাইয়ের ন্যূনতম চেষ্টাও করেন না। এর ফলে অসত্য তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে সত্য প্রকাশ পেলেও সেই বিভ্রান্তি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয় না।
রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি ডিজিটাল আচরণবিধি প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। দলীয় পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নেতাকর্মীদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত—কোনো অবস্থাতেই গুজব প্রচার করা যাবে না, ব্যক্তিগত আক্রমণ করা যাবে না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করা যাবে না এবং যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার করা যাবে না। এতে দলের ভাবমূর্তি যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি গণতান্ত্রিক পরিবেশও সুস্থ থাকবে।
অতি উৎসাহী অনুসারীদের অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাঁদের একটি দায়িত্বহীন পোস্ট রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চেয়ে নিজেদের দলেরই বেশি ক্ষতি করছে। কারণ বিরোধীরা সেই পোস্টকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করে পুরো দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ পায়। ফলে আবেগের বশবর্তী হয়ে করা একটি মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
একটি পরিণত গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শত্রু নয়; তারা ভিন্নমতের প্রতিনিধি। মতের পার্থক্য থাকবে, সমালোচনা থাকবে, বিতর্ক থাকবে—কিন্তু ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, গালি কিংবা ঘৃণার রাজনীতি কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন যুক্তি দিয়ে যুক্তির মোকাবিলা করা হবে, তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তির জবাব দেওয়া হবে এবং শালীনতার মাধ্যমে বিরোধিতাকে প্রকাশ করা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতাও একটি বড় সমস্যা। কেউ কেউ বেশি লাইক, শেয়ার কিংবা ভাইরাল হওয়ার আশায় অতিরঞ্জিত বক্তব্য দেন। এতে সাময়িকভাবে আলোচনায় আসা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি ও দলের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়। রাজনৈতিক যোগাযোগের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত বিশ্বাসযোগ্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং সত্যনিষ্ঠা।
আজকের বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার দিকে এগোতে চায়। এই অগ্রযাত্রায় রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করতে হলে দায়িত্বশীল মতপ্রকাশের সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে গুজব, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার প্ল্যাটফর্মে পরিণত না করে তথ্য, যুক্তি এবং সচেতনতার প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা প্রয়োজন।
প্রতিটি রাজনৈতিক নেতার উচিত তাঁর অনুসারীদের নিয়মিত এই বার্তা দেওয়া যে দলীয় আনুগত্য মানে অশালীনতা নয়, বরং শৃঙ্খলা। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো রাজনৈতিক সাফল্য নয়; বরং নৈতিক পরাজয়। একজন দায়িত্বশীল নেতা কখনো তাঁর অনুসারীদের ঘৃণা ছড়াতে উৎসাহিত করেন না। বরং তিনি আইন, শৃঙ্খলা, সত্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন কেবল ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের ক্ষেত্র নয়; এটি জনমত গঠনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। এই মাধ্যমকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা না গেলে ব্যক্তি, নেতা, রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্র সবারই ক্ষতি হবে। অতি উৎসাহী অনুসারীদের লাগাম টানা মানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা নয়; বরং সেই স্বাধীনতাকে দায়িত্বশীল, শালীন এবং সত্যনিষ্ঠ ব্যবহারের পথে পরিচালিত করা। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এখনই এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিভাজনের নয়, বরং গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী করার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অন্যথায় অতি কথন, প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ, তথ্যবিভ্রান্তি এবং কৃত্রিম উত্তেজনার এই সংস্কৃতি একসময় এমন অপূরণীয় ক্ষতির জন্ম দেবে, যার দায় এড়ানো কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।
লেখক -সাংবাদিক।