• মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯:২২ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
প্রবাসী কার্ডধারীদের জন্য বিমান টিকিটে বিশেষ সুবিধা যুক্ত হবে: বিমানমন্ত্রী বিএফটিআইকে আন্তর্জাতিক মানের থিংক ট্যাংক হিসেবে গড়ে তোলা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী বিএনপি সরকার নিয়ে সমালোচনার জবাবে যা বললেন আযম খান সাদা পোশাকে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে: সমাজবাদী নেতার দাবি হামের ভয়াবহতায় ঝরল আরও ৪ শিশুর জীবন ঠাকুরগাঁওয়ে বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব কার্যক্রমের উদ্বোধন করলেন আইনমন্ত্রী মেসির চোখের জল দেখে আবেগী শশী, বললেন ‘দয়া করে কেঁদো না’ সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন রাশেদ সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে সরকার: তথ্য উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে নেতাদের জন্য যা যা ছিল

টক্সিক মানসিকতার বিস্তার: সামাজিক সম্প্রীতির নীরব সংকট

বিপ্লব সিকদার / ২২ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

একটি সভ্য সমাজ কেবল অবকাঠামো, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা, সহনশীলতা এবং নৈতিক মূল্যবোধে। যে সমাজে মানুষ একে অপরের সাফল্যে আনন্দিত হয়, বিপদে পাশে দাঁড়ায় এবং মতের ভিন্নতাকে সম্মান করে, সেই সমাজই টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান সময়ে আমরা এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে নেতিবাচক ও টক্সিক মানসিকতা গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে বিস্তার লাভ করছে। এই প্রবণতা নীরবে সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং মানবিক সম্পর্ককে ক্ষয় করে দিচ্ছে।

একসময় গ্রামীণ সমাজকে সামাজিক বন্ধনের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখে সবাই অংশ নিত, মতভেদ থাকলেও সম্পর্ক ভেঙে যেত না। শহরেও সামাজিক ও পেশাগত সম্পর্কের মধ্যে সৌজন্য ও পারস্পরিক সম্মানের একটি সংস্কৃতি ছিল। আজ সেই চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই বদলে গেছে। ব্যক্তি স্বার্থ, প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অতি আত্মকেন্দ্রিকতার কারণে মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা কমছে। অন্যের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হওয়ার পরিবর্তে অনেকেই সেটিকে হিংসার চোখে দেখছেন। অন্যকে ছোট করা, ব্যর্থ প্রমাণ করা কিংবা অপমান করার প্রবণতা যেন সামাজিক আচরণের অংশ হয়ে উঠছে।

টক্সিক মানসিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অকারণ নেতিবাচকতা। কোনো ভালো উদ্যোগের প্রশংসা না করে তার ত্রুটি খোঁজা, যাচাই ছাড়া অভিযোগ তোলা, গুজব ছড়ানো, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপপ্রচার কিংবা বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি করে। এতে শুধু ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজের আস্থার ভিত্তি। মানুষ একে অপরের প্রতি বিশ্বাস হারাতে শুরু করে। সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং শত্রুতার পরিবেশ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রযুক্তি মানুষের যোগাযোগ সহজ করেছে, জ্ঞান অর্জনের সুযোগ বাড়িয়েছে এবং মতপ্রকাশের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি অসত্য তথ্য, গুজব, বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য এবং চরিত্রহননের একটি দ্রুতগতির মাধ্যমেও পরিণত হয়েছে। একটি যাচাইবিহীন পোস্ট, একটি বিভ্রান্তিকর ছবি কিংবা একটি উসকানিমূলক মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এর ফলে ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান এমনকি পুরো সমাজও ক্ষতির মুখে পড়ছে।

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, ভিন্নমতকে এখন অনেক ক্ষেত্রেই শত্রুতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতের পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। যুক্তি দিয়ে মতের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়, তখন তা শুধু ভিন্নমতকে দমনই করে না, সমাজে অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতিও প্রতিষ্ঠা করে। এই প্রবণতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।

পরিবারেও টক্সিক আচরণের প্রভাব স্পষ্ট। পারস্পরিক সম্মানের অভাব, অপ্রয়োজনীয় তুলনা, মানসিক চাপ, অবজ্ঞা এবং অবমাননাকর ভাষা পারিবারিক সম্পর্ককে দুর্বল করে। শিশু ও কিশোররা বড়দের কাছ থেকেই আচরণ শেখে। তারা যদি প্রতিনিয়ত বিদ্বেষ, কটূক্তি ও অসহিষ্ণুতা দেখে বড় হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তারাও সেই আচরণকে স্বাভাবিক মনে করবে। ফলে সমস্যাটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও এই সংকটের বাইরে নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহপাঠীদের নিয়ে বিদ্রূপ, সামাজিক বুলিং, অনলাইন হয়রানি এবং অসহিষ্ণু আচরণ বাড়ছে। শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়; শিক্ষা মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলারও মাধ্যম। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

কর্মক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। সহকর্মীর সাফল্যে ঈর্ষা, অযৌক্তিক প্রতিযোগিতা, পরনিন্দা, ষড়যন্ত্র কিংবা অন্যের কাজের কৃতিত্ব নিজের নামে নেওয়ার প্রবণতা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশকে নষ্ট করে। এর ফলে উৎপাদনশীলতা কমে, দক্ষ কর্মীরা নিরুৎসাহিত হন এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।

রাজনীতি, সামাজিক সংগঠন ও জনজীবনেও টক্সিক আচরণের প্রভাব উদ্বেগজনক। মতপার্থক্যকে শত্রুতা হিসেবে দেখা, সংলাপের পরিবর্তে সংঘাতকে উৎসাহিত করা কিংবা ভিন্ন মতের মানুষের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে পারস্পরিক সম্মান, যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং সহিষ্ণু মনোভাবের বিকল্প নেই।

গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ, যাচাইকৃত এবং দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন যেমন সমাজে আস্থা তৈরি করে, তেমনি অতিরঞ্জিত, বিভ্রান্তিকর কিংবা যাচাইহীন তথ্য মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও মনে রাখতে হবে, একটি মন্তব্য বা একটি পোস্ট অনেক মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ আজ সময়ের দাবি।টক্সিক মানসিকতা দূর করার কাজ শুধু আইন দিয়ে সম্ভব নয়। এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ। এর সমাধানের জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম, রাষ্ট্র এবং প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবারে সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা, সহনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের চর্চা বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য শেয়ার করার আগে সত্যতা যাচাই করতে হবে এবং মত প্রকাশের ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখতে হবে।সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে তোলা। আমরা অন্যের ভুল সহজেই দেখি, কিন্তু নিজের আচরণ মূল্যায়ন করি খুব কম। সমাজ পরিবর্তনের শুরুটা নিজের থেকেই হতে পারে। আমরা যদি অন্যকে সম্মান করি, সত্যকে মূল্য দিই, গুজব ও অপপ্রচার থেকে দূরে থাকি এবং ভিন্ন মতকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে শিখি, তাহলে সমাজও ধীরে ধীরে ইতিবাচক পথে এগোবে।আজ উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষয় হতে থাকলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। উন্নত সমাজ গড়তে হলে মানুষের মনও উন্নত হতে হবে। সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ, সততা, সহিষ্ণুতা এবং মানবিকতা এই মূল্যবোধগুলোর পুনর্জাগরণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।টক্সিক মানসিকতা কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের একক সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য একটি নীরব সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় দোষারোপের রাজনীতি নয়, প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং ইতিবাচক সামাজিক চর্চা। কারণ একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়, বরং তার মানুষের চরিত্র, মানবিকতা এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে টক্সিক মানসিকতাকে না বলি এবং একটি সহনশীল, মানবিক, যুক্তিবাদী ও সম্প্রীতিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করি।

 

লেখক – সাংবাদিক।


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন