সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার ছনকা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমির খসরুর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩০ টাকা করে পরীক্ষার ফি আদায়ের অভিযোগের তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
ছনকা গ্রামের অভিভাবক সদস্য শেখ আতাউর রহমান গত ১৪ জুলাই জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। এর প্রেক্ষিতে সোমবার (২৭ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তদন্ত কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক কুমার রায়ের গঠিত তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দেন উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা যতি শংকর রায়, আবু সেলিম ও আব্দুর রাকিব। তদন্তকালে অভিভাবক, স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
তদন্ত চলাকালে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শেখ লুৎফর রহমান, অভিযোগকারী শেখ আতাউর রহমান এবং তাঁদের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ, পাল্টাপাল্টি মামলা এবং ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে মতবিরোধের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।
উপস্থিত অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে তকদির হোসেন, শফিকুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ, সিরাজুল ইসলাম, আমজাদ হোসেন, কেরামত আলী, শরিফুল ইসলাম ও শেখ কামরুজ্জামানসহ অনেকে বক্তব্যে বলেন, সরকারি বিধানে পরীক্ষার ফি নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও প্রধান শিক্ষক আমির খসরু নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায় করেছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক আমির খসরু বলেন, ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল তৎকালীন অ্যাডহক কমিটির সভায় বিদ্যালয়ের স্লিপের অর্থের স্বল্পতার কারণে প্রশ্নপত্রের খরচ বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এ বাবদ অর্থ নেওয়া হয়নি।
তৎকালীন অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ও উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রাকিব জানান, বিদ্যালয়ের তহবিলে অর্থের সংকট থাকলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি হিসেবে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি। তবে কয়েকজন নারী অভিভাবক স্বেচ্ছায় কাউকে না জানিয়ে কিছু অর্থ দিয়েছিলেন।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা রেহানা খাতুন বলেন, পরীক্ষার ফি হিসেবে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি। তবে যেসব শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ছিল, তারা হ্যান্ডনোট ফটোকপির খরচ হিসেবে ১০ থেকে ১৫ টাকা করে দিয়েছিল। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের কোনো নির্দেশনা ছিল না।
তিনি আরও বলেন, কয়েকজন অভিভাবক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে স্বেচ্ছায় কিছু অর্থ প্রদান করেন। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রধান শিক্ষককে সামাজিকভাবে হয়রানির উদ্দেশ্যে অভিযোগ করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শেখ লুৎফর রহমান বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হোক, তা কেউ চান না। তবে তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ভাই শেখ আতাউর রহমান বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে হয়রানি করে আসছেন। এর আগে ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়েও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করা হলেও তার সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত এ বিদ্যালয়ে এর আগে কোনো অভিভাবকের কাছ থেকে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি ও উজ্জীবনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোস্তাহিদ রহমান বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত করা হবে। প্রধান শিক্ষকের কোনো গাফিলতি প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডও বরদাশত করা হবে না।
তদন্ত শেষে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা যতি শংকর রায় ও আবু সেলিম সাংবাদিকদের জানান, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হবে না।
স্থানীয়দের দাবি, পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে গত দুই থেকে তিন দশক ধরে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একের পর এক অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের ঘটনা ঘটছে।