• সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৫ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
সর্বশেষ
গোমস্তাপুরে র‍্যাবের অভিযানে ২২৮ বোতল ফেনসিডিলসহ ২ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইন্সে অত্যাধুনিক ফিজিওথেরাপি সেন্টারের উদ্বোধন শিবগঞ্জে ডিবি পুলিশের অভিযানে ইয়াবাসহ যুবক গ্রেপ্তার “ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নে আসছে স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন নেতৃত্ব” বাগেরহাটে আইনজীবী হত্যা মামলার প্রধান আসামিসহ গ্রেপ্তার ৪ সেননগর বাজারের মারধরের জেরে রক্তাক্ত চর বিনোদপুর, প্রাণ গেল কুহিনূরের নবগঠিত ১০ নম্বর ইয়ারপুর ইউনিয়নবাসীকে অভিনন্দন জানালেন রবিউল হক (মানিক) মেম্বার আশিয়ান সিটির নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে চিত্রনায়িকাকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ আনোয়ারা চায়না ইকোনমিক জোনে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হবে: অর্থমন্ত্রী কুবিতে মার্কেটিং বিভাগের উদ্যোগে ‘উদ্যোক্তা মেলা’

সেননগর বাজারের মারধরের জেরে রক্তাক্ত চর বিনোদপুর, প্রাণ গেল কুহিনূরের

নিজস্ব সংবাদ দাতা / ২২ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

বিপ্লব সিকদার:

২৬ জুলাইয়ের বিকেল। সময় যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় মেঘনার চরাঞ্চলে। একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মুহূর্তেই বদলে যায় শত শত মানুষের জীবন। যে গ্রামের মানুষ সকালে নিজের উঠানে হাঁটছিলেন, বিকেলে সেই গ্রামের নারীরা আশ্রয় নেন নদীর ওপারের একটি বাজারের সেডে। নিজেদের ঘরের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকেন তাঁরা। নিজের গ্রামেই যেন আজ তাঁরা শরণার্থী।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সেননগর বাজারে চর ভাটেরা এলাকার শাহবাজসহ আরও এক ব্যক্তিকে আটক করে চর বিনোদপুর গ্রামের আলী আকবর মাতব্বর ও তাঁর সহযোগীরা মারধর করেন। পরে তাঁদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এর জের ধরে চর ভাটেরা এলাকার লোকজন দেশীয় অস্ত্র—টেটা, বল্লমসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র নিয়ে চর বিনোদপুর গ্রামে অতর্কিত হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলায় টেটাবিদ্ধ হয়ে নিহত হন কুহিনূর বেগম (৪০)। আহত হন অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন। গুরুতর আহত ১০ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পুরুষদের অধিকাংশই হাসপাতালে আহত স্বজনদের নিয়ে ব্যস্ত। আর গ্রামের নারীরা শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আলিপুর ঘাট বাজারের সেডে। সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁরা বারবার তাকিয়ে থাকছেন নদীর ওপারে ফেলে আসা নিজেদের বাড়ির দিকে। কেউ জানেন না, কখন ফিরতে পারবেন। ফিরলেও ঘরটি আগের মতো থাকবে কি না, সেই উত্তরও অজানা।

এক নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ঘরে গেলে মরব, না গেলে যা আছে তাও হারাব। কী করব বুঝতে পারছি না।”

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলাকারীরা ঘরের মালামাল, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে। এখন তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নতুন করে কীভাবে জীবন শুরু হবে?

স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও সদস্য প্রয়োজন। তাঁদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় আবারও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেই ভয়েই কেউ ঘরে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না।

মেঘনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম বলেন, কুহিনূর বেগম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চারজনকে আটক করা হয়েছে। তাঁরা হলেন তিতাস উপজেলার চর কাঠালিয়া (চর ভাটেরা) এলাকার মো. হান্নান (২৬), মো. মাইনুদ্দিন (৪২), মো. কাশেম বেপারী (৬০) এবং মো. রানা মিয়া (২১)। মামলা না হওয়ায় তাঁদের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো কোনো এজাহার দায়ের হয়নি। পুলিশ আইনগত কার্যক্রম ও সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি চর ভাটেরা এলাকায় লোকজন জড়ো হওয়ার খবর পেয়ে সেখানেও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এটি এই বিরোধের প্রথম রক্তপাত নয়। গত ১৫ জুন একই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন এবং বহু বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এক মাসের ব্যবধানে আবারও সেই বিরোধ প্রাণ কেড়ে নিল এক নারীর, আর শতাধিক মানুষকে ঠেলে দিল অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।

সোমবার দুপুরেও আলিপুর ঘাটের সেডে আশ্রয় নেওয়া নারীদের চোখে ছিল একই প্রশ্ন—কবে ফিরবেন নিজের ঘরে? আদৌ কি নিরাপদে ফিরতে পারবেন? নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা নিজেদের বসতভিটা যেন এখন আর শুধু একটি বাড়ি নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া নিশ্চিন্ত জীবনের প্রতীক।

কুহিনূর বেগমের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে আলিপুর ঘাটে পৌঁছালে সেখানে নারী-পুরুষের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়।

স্থানীয় বিএনপির নেতারা আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর পাশে গিয়ে তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু স্বজন হারানোর শোক, ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্ক এবং নতুন করে হামলার ভয়—এসবের সামনে সান্ত্বনার ভাষাও যেন অনেকটাই অসহায়।

চরাঞ্চলের মানুষ নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে অভ্যস্ত। কিন্তু নিজেদের গ্রামেই নিরাপত্তাহীন হয়ে, নিজের বাড়ির দিকে দূর থেকে তাকিয়ে থাকার যে বেদনা, তা হয়তো কোনো পরিসংখ্যান কিংবা মামলার নথিতে ধরা পড়ে না। সময় সত্যিই কথা বলে। আর সেই সময়ই বলে দেয়—একটি সংঘর্ষ শুধু একটি প্রাণই কেড়ে নেয় না, কখনো কখনো একটি গ্রামের মানুষের নিরাপত্তাবোধ, স্বপ্ন এবং স্বাভাবিক জীবনকেও কেড়ে নেয়।

 


আপনার মতামত লিখুন :

মন্তব্য বন্ধ আছে।

এই জাতীয় আরো খবর দেখুন