বর্তমান সরকার যেখানে দেশের প্রতি ইঞ্চি অনাবাদি জমিকে আবাদি জমিতে পরিণত করে দেশকে স্বনির্ভর ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করতে মরিয়া এবং প্রতিটি জেলায়, উপজেলায়, গ্রামে-গঞ্জে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান নিজেই। সেই সময়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের ০৮ নং ওয়ার্ডে আশীষ সরকার নামের এক ব্যবসায়ী দেশের সকল আইন-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হাবিলাসদ্বীপ রাসমন্দিরের দক্ষিণ পাশে বোয়ালখালী খাল ও ব্রাহ্মচারী খালের সংযোগস্থলে, যে খাল দিয়ে পুরো হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের পানি বর্ষা মৌসুমে কর্ণফুলী নদীতে এসে পড়ত, সেই খালের মুখে বাঁধ নির্মাণ করে নিজের প্রায় ১০ একর জমির ওপর ভরাট করা বাগানবাড়ি ও প্লট করে বিক্রির উদ্দেশ্যে ভরাট করা বিশাল জায়গায় যাতায়াতের জন্য খাল ভরাট করে রাস্তা নির্মাণ করেছেন। যার ফলে পানি চলাচলের রাস্তা বন্ধ হয়ে পুরো হাবিলাসদ্বীপ গ্রাম জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।
এই গ্রামে গত কয়েক বছর আগেও শত শত একর জমিতে আবাদ করে কৃষকরা নিজেদের বছরের খাদ্যশস্য উৎপাদন করতেন এবং নানা ধরনের শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন করে সারা বছর স্বাবলম্বী হয়ে হাসিমুখে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতেন। অথচ বর্তমানে আশীষ সরকারের খালের ওপর এই বাঁধ নির্মাণ করে পানি চলাচল বন্ধ করার কারণে পুরো হাবিলাসদ্বীপ গ্রাম এখন জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে একদিকে শত শত একর আবাদি জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে কৃষকদের কপাল পুড়েছে। বেকার জীবনযাপন করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো কৃষক। অথচ আশীষ সরকার প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না।
কিন্তু আজ আমি ওই এলাকায় গিয়ে দেখতে পেলে এলাকার সাধারণ জনগণ ও গরিব কৃষকরা ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ-যন্ত্রণায় ফুঁসে উঠেছেন। যেকোনো সময় এটি নিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন এলাকার জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিক মহল। সরকারি সকল নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের ০৮ নং ওয়ার্ডে সরকারি খালের মধ্যখানে বাঁধ দিয়ে আশীষ সরকারের সাম্রাজ্য গড়ার ফলে হাওড় এলাকায় পরিণত হয়েছে পূর্ব হাবিলাসদ্বীপ ও দক্ষিণ হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের শত একর আবাদি ফসলি জমি। দীর্ঘদিন ধরে অনাবাদি জলাশয়ে পরিণত হয়েছে এসব জমি। একটু বৃষ্টি হলেই পানিতে তলিয়ে যায় হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের দত্তবাড়ি, মজুমদারবাড়ি, মিত্রবাড়ি ও দেবপাড়ার প্রায় ৫০০ পরিবার। পানিবন্দি হয়ে অসহায়, অবর্ণনীয় মানবেতর জীবনযাপন করেন দুই হাজারেরও বেশি মানুষ।
এই বিষয়ে অভিযুক্ত আশীষ সরকারের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, “খান, কত বছরের এটা আমার দেখার বিষয় নয়। এই খাল আরএস-বিএস খতিয়ানে কোনো খাল নেই। তাই আমি ওইদিকে কিছু জমি কিনে একটা প্লট করেছি। এই প্লটে চলাচলের রাস্তা প্রয়োজন, তাই তৎকালীন চেয়ারম্যানকে জানিয়ে আমি এই খাল ভরাট করেছি। তারপরও মাটির নিচে ছোট একটা পাইপ দিয়েছি পানি চলাচলের জন্য। আমি যে জমিগুলো কিনে ভিটা বানিয়েছি, সেই হিসেবে খালটিও আমার কেনা জায়গার ওপর।”
আশীষ সরকার আবারও দাম্ভিক কণ্ঠে বলেন, “সবাই শুধু আমাকে দেখেন কেন? পানি চলাচলের জায়গা তো আরও অনেকে ভরাট করে বাড়িঘর নির্মাণ করেছে। তাদেরগুলো দেখেন না? নিউজ করলে করেন, সমস্যা নেই। এগুলো দিয়ে আমার কিছুই হবে না। আমি প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেব। দেখি কে কী করতে পারে।”
এ বিষয়ে ০৮ নং ওয়ার্ডের সাবেক একাধিকবার নির্বাচিত মেম্বার দোলন কান্তি দত্তের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “এইখানে খালের মতো শত বছরের পুরোনো একটা রেগ (নালা) ছিল। ওইটা দিয়ে হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের পানি ব্রাহ্মচারী খাল হয়ে বোয়ালখালী বড় খালে গিয়ে মিশে যেত। এটা ছিল সম্পূর্ণ সরকারি। কিন্তু গত সরকারের আমলে আশীষ সরকার প্রভাবশালীদের সহায়তায় এই খালের মধ্যখানে বাঁধ নির্মাণ করে তার সাম্রাজ্যে যাওয়ার জন্য রাস্তা নির্মাণ করেছেন। এটা অবশ্যই জনগণের ক্ষতি করেছে।”
এ বিষয়ে বর্তমান হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের তিন ওয়ার্ডের মহিলা মেম্বার বেবি চৌধুরীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে আশীষ সরকারের পক্ষে নিয়ে সরাসরি বলেন, “ঐখানে আমি কোনো খাল কখনোই দেখিনি।” পরে সাংবাদিকের পাল্টা প্রশ্নের জবাবে স্বীকার করেন, “ঐখানে একটা নালা ছিল। এটা দিয়ে গ্রামের পানি নিষ্কাশিত হতো।” এর বেশি তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।
বিষয়টি নিয়ে উপস্থিত হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের শত সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিককে বলেন, “আমরা এই খালের মধ্যখানে বাঁধ নির্মাণ করে আমাদের পানিবন্দি করার বিষয়টি আপনার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মাননীয় কৃষিমন্ত্রী, চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) নির্বাচনী এলাকার মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ এনামুল হক এনাম সাহেব, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক, পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি। আমরা পানিবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি চাই, খালের বাঁধ ভেঙে দিতে চাই। আমাদের শত একর অনাবাদি জলাশয়ে পরিণত হওয়া কৃষিজমিতে আমরা আবারও আগের মতো আবাদ করতে চাই।”