সুন্দরবনের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে বুধবার পালিত হয়েছে বিশ্ব বাঘ দিবস।
‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বন বিভাগ ও সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে দিবসটি উপলক্ষে বাঘ সংরক্ষণে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে সুন্দরবন অ্যাকাডেমিক ট্রাস্ট।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দিবসের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকার বন ভবনে আলোচনা সভা ও র্যালির আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া বাঘের প্রধান আবাসস্থল সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জ এলাকায় স্থানীয় বন বিভাগের উদ্যোগে র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনও দিবসটি উপলক্ষে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেছে।
বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস পালিত হচ্ছে বুধবার (২৯ জুলাই)। দিবসটি উপলক্ষে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ শুধু একটি বিপন্ন প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সর্বশেষ শুমারিতে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টি। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালে ছিল ১১৪টি। ধারাবাহিক এই বৃদ্ধি সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কঠোর আইন প্রয়োগ, স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে বর্তমানে বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবুও চোরা শিকার, পাচার, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো নানা হুমকি এখনো সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্বের জন্য বড় উদ্বেগ।
বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে, যখন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত হয়। এরপর থেকে বন বিভাগ প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করে।
তবে গত আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে চোরা শিকারি ও পাচারকারীদের হাতে ২৬টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, গ্রামবাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বার্ধক্যে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনটি বাঘ মারা গেছে। এছাড়া উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন বাঘের চামড়ার সূত্র ধরে আরও কয়েকটি বাঘ পাচারের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সেসব ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষিত নেই। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী।
বর্তমানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। স্মার্ট পেট্রোলিং, নিয়মিত টহল, ড্রোন ও ক্যামেরা ট্র্যাপের ব্যবহার, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে মানুষ-বাঘের সংঘাত কমেছে। এর ইতিবাচক ফল হিসেবে ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে কোনো বাঘ হত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। বন বিভাগের সদস্যরা সেটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা দেন। পরে গত ১২ জুলাই সুস্থ হওয়া বাঘিনীকে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। বাঘিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণে বনাঞ্চলের প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বন বিভাগ এ ঘটনাকে বাঘ সংরক্ষণের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দেখছে।
এদিকে বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রাক্কালে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে পূর্ব সুন্দরবনে দুই দফা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলেছে। প্রথমে চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন অফিস চত্বরে এবং পরে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় নদী সাঁতরাতে দেখা যায় একটি বাঘটিকে।
গত ২৪ জুলাই আন্ধারমানিক বন অফিসের সামনে একটি বাঘিনী কিছুক্ষণ খোলা জায়গায় অবস্থান করে আবার জঙ্গলে ফিরে যায়। এরপর ২৬ জুলাই সকালে কচিখালী টাইগার পয়েন্ট এলাকায় টহলরত বন বিভাগের একটি বোটের সামনে একটি বাঘকে নদী সাঁতরাতে দেখা যায়। বোটের শব্দ শুনে বাঘটি মাঝপথ থেকে ফিরে যায়। বন বিভাগের স্মার্ট টিমের বোটচালক সাইফুর রহমান সেই বিরল দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনে বাঘের উপস্থিতি ও সংখ্যা বৃদ্ধি পুরো বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাঘ সংরক্ষণ করা গেলে শুধু একটি প্রাণী নয়, সুন্দরবনের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যশৃঙ্খলও সুরক্ষিত থাকে।
সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষা এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে বন অপরাধ দমন, চোরা শিকার বন্ধ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব বাঘ দিবসে সংশ্লিষ্টদের আহ্বান—বাঘকে শুধু সুন্দরবনের প্রতীক হিসেবে দেখলে হবে না; এর নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে হবে। বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, আর সুন্দরবন টিকে থাকলেই উপকূলীয় মানুষের জীবন ও পরিবেশের সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে।