ঢাকা   ০৬:০৪:৩৫ এএম, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাইয়ের রক্তমাখা পোশাক দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন শহীদ হৃদয়ের বাবা

Reporter Name
  • Update Time : Saturday, August 8, 2026,
  • 65 Time View
  • ৬ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

বিন্দুবাংলা টিভি. কম, ডেস্ক রিপোর্টঃ

দুপুরের আকাশে ঝুম বৃষ্টি, ক্যাম্পাসজুড়ে কোথাও বিদ্যুৎ নেই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) জাদুঘরে তখন অন্ধকার আর পিনপতন নীরবতা।

এর মধ্যেই হঠাৎ চোখে পড়ল জুলাই গণঅভ্যুত্থান হলে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে কেউ একজন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার রক্তমাখা শার্ট-প্যান্টের দিকে। একটু পরেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি।

কান্নারত ব্যক্তিটি আর কেউ নন, শহীদ হৃদয়ের বাবা রতন চন্দ্র তরুয়া। বুধবার (৫ আগস্ট) জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে চবি প্রশাসনের আমন্ত্রণে ক্যাম্পাসে আসেন তিনি। এরপর বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বৃষ্টি-বাদল উপেক্ষা করেই রতন চন্দ্র চলে যান বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে।

সেখানে কাঁচের ভেতরে সংরক্ষণ করা আছে হৃদয় তরুয়ার রক্তমাখা শার্ট ও প্যান্ট। এই পোশাক পরিহিত অবস্থাতেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় ১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন তিনি। কিছুক্ষণ নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকার পর কাঁপা কাঁপা হাতে কাঁচের ওপর হাত বুলিয়ে দেন বাবা রতন চন্দ্র। যেন ওপাশে এখনো দাঁড়িয়ে আছে তার বুকের মানিক হৃদয়।

এরপর আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। আর সেই অশ্রু যেন কাঁচের ওপাশে জমে থাকা রক্তের দাগের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। এই দৃশ্য উপস্থিত অনেকের চোখও অশ্রুসজল করে দেয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি রক্তমাখা শার্ট-প্যান্ট, অন্যদের কাছে কেবল জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষিত একটি নিদর্শন। কিন্তু সন্তানহারা এক বাবার কাছে এটি তার সন্তানের শেষ স্পর্শ, শেষ ঘ্রাণ, শেষ স্মৃতি আর শেষ আলিঙ্গনের প্রতীক। তাই কাঁচের ভেতরে বন্দি সেই পোশাকের দিকে তাকিয়ে হয়তো বাবা খুঁজে ফিরছিলেন ছেলের মুখ, শোনার চেষ্টা করছিলেন তার কণ্ঠস্বর।

শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার রক্তমাখা শার্টের দিকে ইশারা করে অশ্রুসিক্ত রতন চন্দ্র তরুয়া বলেন, ‘মানুষের বাসায় কাজ করে সেই টাকা দিয়ে এই শার্টটাই ওর মা ওরে (হৃদয়) কিনে দিছিল। ওই শার্ট পইরাই ও শহীদ হয়ে গেছে।’

কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রতন চন্দ্র তরুয়া। অস্ফুট স্বরে তিনি বলতে থাকেন, ‘আমি কাঠমিস্ত্রির কাজ করতাম। ওর মা মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করত। আমরা সাধারণ পরিবারের। ভাড়া বাড়িতে থাকি। ওর একটাই চিন্তা ছিল, পড়ালেখা করে কিছু করা।’

রতন চন্দ্র তরুয়া জানান, তার একমাত্র ছেলে সন্তান ছিল হৃদয়। তাকে হারানোর পর নিজের শূন্য ঘরে একমাত্র মেয়ে, মেয়ের স্বামী আর নাতনিকে নিয়ে এসেছেন।

সন্তান হত্যার বিচার প্রসঙ্গে রতন চন্দ্র বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। তার ওপর আমার বাড়ি অনেক দূর। এখানকার কাউকে চিনি না। তাই, আমি মামলা করতে চাইনি। একজন বাদী হয়ে ২৬৫ জনকে আসামি করে একটা মামলা করেছে। কিন্তু তারা সে মামলা নিয়ে রাজনীতি করতেছে, ব্যবসা করতেছে। আমি ছেলে হত্যার বিচারের পাশাপাশি যারা হত্যা মামলা নিয়ে ব্যবসা করতেছে, তাদেরও বিচার চাই।’

হৃদয় চন্দ্র তরুয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার দরিদ্র পরিবারের ছেলে হৃদয়।

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন হৃদয়। পরে ২৩ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি