https://bindubanglatv.com/
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে নয়াদিল্লিতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। সফরের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে ভারত। গত কয়েক দিনে দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক তৎপরতায় এর স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করে ঢাকায় ফিরে যাওয়া বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীর এই সফরকে ঘিরে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতের কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, তারেক রহমানের সফরের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে আগস্টের শেষ সপ্তাহকে সামনে রেখে সম্ভাব্য সফরের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নয়াদিল্লির মূল লক্ষ্য হচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া টানাপোড়েন কাটিয়ে নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি করা। তারেক রহমান দিল্লিতে গেলে শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে সরাসরি আলোচনায় বসতে চায় ভারত।
ভারতের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিকসের বিশেষ অধিবেশনেও তাকে আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলা হয়েছে। সফরের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জায়সওয়াল জানিয়েছেন, কোনো অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে।
তবে নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক তৎপরতা দেখে কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ভারত শুধু আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েই থেমে নেই। বরং তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরকে দুই দেশের সম্পর্কে জমে থাকা দূরত্ব কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে মোদি সরকার। নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতীতের রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে একমাত্র নিয়ামক না করে বাস্তব স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর পথ খুঁজছে নয়াদিল্লি।
ভারতের কাছে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রিকেট সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, জ্বালানি সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের কিছু বিষয় পুনর্বিবেচনা এবং গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন। এসব বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখার বার্তাই দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
ভারতের এক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার বক্তব্যেও দেশটির এই মনোভাবের প্রতিফলন পাওয়া গেছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, বাংলাদেশ যদি একটি যানবাহন চায়, ভারত প্রয়োজনে তার চেয়েও বেশি সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। অর্থাৎ ঢাকার প্রয়োজন ও চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সহযোগিতার পরিসর বাড়াতে নয়াদিল্লির আপত্তি নেই। তবে ভারতের অবস্থান হলো, কোনো ধরনের শর্ত বা চাপের ভিত্তিতে নয়; বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, এই আলোচনায় সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। এ বিষয়ে ভারত এখনো কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিতে চাইছে না। নয়াদিল্লি প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই রাখতে আগ্রহী। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আইনি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের ক্ষেত্রে জ্বালানি সহযোগিতাকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারত। বাংলাদেশ ভারতের কাছে পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও বেশি জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে ডিজেল সরবরাহের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর পাশাপাশি বাড়তি জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিও বিবেচনা করছে ভারত।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চাহিদা, ভারতের পরিশোধন সক্ষমতা এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনা করা হবে। বাংলাদেশের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে।
দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্ক নিয়েও দিল্লির আগ্রহ রয়েছে। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কেও পড়েছে। বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের ভারতীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, দুই দেশের ক্রিকেটীয় যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সফর নিয়ে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা দূর করার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। ক্রিকেটকে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও দেখছে কূটনৈতিক মহল।
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কিছু বিধিনিষেধ ও বাণিজ্যিক জটিলতা পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ আরও সহজ করার বিষয়ে ভারত আগ্রহী বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়নের বিষয়টিও আলোচনার টেবিলে গুরুত্ব পেতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের দিল্লি সফর বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর সফর হবে না; বরং অর্থনীতি, জ্বালানি, বাণিজ্য, পানি, ক্রীড়া এবং জনসম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। ভারত চাইছে, মতপার্থক্য থাকলেও ঢাকা-দিল্লির মধ্যে যোগাযোগের পথ যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান অপরিবর্তিত রেখেই বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর পথ খুঁজছে মোদি সরকার। ফলে সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে যে বার্তা পাওয়া যাচ্ছে তা হলো—বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককে অতীতের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে আটকে রাখতে চায় না ভারত। তারেক রহমান দিল্লিতে গেলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দীর্ঘদিনের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে সরাসরি আলোচনা এবং নতুন বাস্তবতায় সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সফরের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে দিল্লির প্রস্তুতি ও আগ্রহ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, সফরটি সফল হলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।