ঢাকা   ০৬:৩৯:০২ এএম, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
মেঘনায় বিএনপি নেতা মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ, ওসি-ইউএনও’র দাবি তর্কাতর্কি চারদিনের সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী চৌদ্দগ্রাম দত্তসার রহমানীয়া মাদ্রাসার মাহফিল ১৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শহীদ জেহাদের পরিবারের সৌজন্য সাক্ষাৎ অনির্দিষ্টকালের জন্য রিয়াদের ফ্লাইট স্থগিত করল বিমান বিদ্যুৎ সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন কম : সংসদীয় কমিটি ডেঙ্গুতে ৪ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৬৩১ জন আমদানি নির্ভর জ্বালানি থেকে বের হতে চায় সরকার: অর্থমন্ত্রী দেশে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত রয়েছে : খাদ্যমন্ত্রী হাম উপসর্গে আরও ৮ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১০৮৬

অনন্ত আলোর ফোয়ারা ~ মুফতী আশরাফুল হক রাকিব

Reporter Name
  • Update Time : Tuesday, August 25, 2026,
  • 35 Time View

মনুষ্যজীবন পথ চলে, কিন্তু সব পথ গন্তব্যে পৌঁছায় না। অন্ধকারে পথ হারানো মানুষ যেমন এক টুকরো আলোর জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তেমনি জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে ক্লান্ত মানুষও খুঁজে ফেরে এমন একজন আদর্শ মানুষকে, যার জীবন তাকে সত্যের পথে অবিচল থাকতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে শেখায়। পৃথিবীর ইতিহাসে অসংখ্য মনীষী এসেছেন, অসংখ্য মহান ব্যক্তিত্ব তাঁদের কর্ম ও কীর্তিতে স্মরণীয় হয়ে আছেন। কিন্তু এমন একজন মানুষ, যাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সমগ্র মানবতার জন্য আদর্শ—সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।

তাঁর জীবন অনন্ত মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের প্রতিচ্ছবি, যেখানে সত্যের দীপ্তি, ন্যায়ের দৃঢ়তা, ভালোবাসার কোমলতা, ক্ষমার মহত্ত্ব এবং মানবতার অপূর্ব সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। তিনি ছিলেন এমন এক পূর্ণিমার চাঁদ, যার আলো শুধু একটি জনপদকে নয়, বরং তামাম জাহান ও মানবসভ্যতাকে আলোকিত করেছে।

নবুওয়াত লাভের বহু আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে চিনত ‘আস-সাদিক’ (সত্যবাদী) এবং ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত) উপাধিতে। তৎকালীন সমাজে মিথ্যা, গোত্রীয় অহংকার ও অন্যায় ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। সেই সমাজেই মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সততা ও আমানতদারিতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর বিরোধীরাও তাঁর চরিত্রে কখনো কলঙ্ক খুঁজে পায়নি। আজ যখন সামান্য স্বার্থের জন্য মানুষ সত্যকে বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সত্যের পথ কখনো সহজ নয়, কিন্তু সত্যের চেয়ে সুন্দর কোনো পথও নেই।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অধ্যায়গুলোর একটি হলো তায়েফের ঘটনা। ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি তায়েফে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানো হয়নি; বরং উপহাস, অপমান ও পাথরের আঘাতে তাঁর শরীর রক্তাক্ত করা হয়েছিল। রক্তে তাঁর পবিত্র পা রঞ্জিত হয়েছিল। সেই ভয়াবহ মুহূর্তে পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা এসে প্রস্তাব দিলেন, আপনি চাইলে তায়েফবাসীকে দুই পাহাড়ের মাঝে পিষে দেওয়া হবে। কিন্তু প্রতিশোধের সুযোগ পেয়েও তিনি প্রতিশোধ নিলেন না। তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি মমতা। হয়তো তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে।

এটাই মুহাম্মদ (সা.)। যাঁর শরীর রক্তাক্ত হতে পারে, কিন্তু হৃদয় প্রতিহিংসায় রক্তাক্ত হয় না। যাঁকে পাথর মারা যায়, কিন্তু তাঁর মুখ থেকে অভিশাপ বের হয় না। পৃথিবীর ইতিহাসে ক্ষমার এমন সৌন্দর্য সত্যিই বিরল।

তিনি ছিলেন ভালোবাসার নবী। এতিম, দরিদ্র, অসহায়, মিসকিন ও দুর্বল মানুষের প্রতি তাঁর হৃদয় ছিল অসীম কোমল। শিশুদের দেখলে তিনি তাদের সালাম দিতেন, আদর করতেন, কোলে তুলে নিতেন। কখনো কোনো শিশুর কান্না শুনে নামাজ দীর্ঘ না করে সংক্ষিপ্ত করেছেন, কারণ তাঁর কাছে ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের কষ্টের প্রতিও ছিল গভীর সংবেদনশীলতা।

একবার তিনি তাঁর নাতি হযরত হাসান (রা.)-কে চুমু দিচ্ছিলেন। একজন সাহাবি তা দেখে বললেন, তাঁর দশটি সন্তান আছে, কিন্তু তিনি কাউকেই চুমু দেননি। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না। কত ছোট্ট একটি ঘটনা, অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি বিশাল মানবিক দর্শন—ভালোবাসা দুর্বলতা নয়; ভালোবাসাই মানুষের হৃদয়কে মানুষ করে তোলে।

প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীকে রেখে নিজের পেট ভরে খাওয়ার মানসিকতা তিনি কখনো সমর্থন করেননি। তাঁর শিক্ষা ছিল, মানুষের ঈমান শুধু মসজিদের জায়নামাজে প্রকাশ পায় না; বরং প্রতিবেশীর দরজায়, অসহায়ের পাশে, ক্ষুধার্তের মুখে এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের চোখের জল মুছে দেওয়ার মধ্যেও ঈমানের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।

প্রাণীর প্রতিও তাঁর দয়া ছিল অসাধারণ। একটি তৃষ্ণার্ত প্রাণীকে পানি পান করানোর মতো সামান্য কাজও আল্লাহর কাছে কত বড় মর্যাদা লাভ করতে পারে, তিনি তা শিক্ষা দিয়েছেন। অযথা কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া, জীবজন্তুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা থেকে তিনি মানুষকে সতর্ক করেছেন। তাঁর জীবন যেন আমাদের বলে, যে হৃদয় মানুষের জন্য কোমল, সেই হৃদয় সৃষ্টির প্রতিটি প্রাণের প্রতিও কোমল হবে।

ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল। নিজের আপনজন হলেও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি কখনো। একবার কুরাইশ বংশের এক নারী চুরি করেছিল। বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছালে তার ব্যাপারে শাস্তি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তখন কুরাইশের লোকেরা বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়ল। তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় সাহাবি ও তাঁর ঘনিষ্ঠজন উসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-কে সুপারিশ করার জন্য পাঠাল। উসামা (রা.) যখন তার ব্যাপারে সুপারিশ করলেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিলেন। তিনি বললেন, “তোমরা কি আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তির ব্যাপারে সুপারিশ করছ?” এরপর তিনি মানুষকে সতর্ক করে বললেন, পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তাদের কোনো সম্মানিত ব্যক্তি চুরি করলে তারা তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল কেউ চুরি করলে তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। তারপর তিনি ঘোষণা করলেন, “আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, তবে আমি তার হাত কাটতাম।”

কী অসাধারণ ন্যায়বিচার! এখানে রক্তের সম্পর্ক, বংশমর্যাদা, সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রভাব—কোনোটিই প্রাধান্য পায়নি। তাঁর কাছে ন্যায় ছিল সবার জন্য সমান। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, ইসলামি ন্যায়বিচারে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিবেচ্য। আজকের পৃথিবীতে যখন ক্ষমতাবান ও দুর্বল মানুষের জন্য আইনের প্রয়োগে বৈষম্যের অভিযোগ ওঠে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই শিক্ষা আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল ন্যায়বোধের দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

আর মক্কা বিজয়ের দিন তাঁর ক্ষমাশীলতার যে দৃশ্য পৃথিবী দেখেছিল, তা মানবতার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। যারা তাঁকে ও তাঁর সাহাবিদের বছরের পর বছর নির্যাতন করেছিল, ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করেছিল, যুদ্ধ করেছিল, একদিন তারা সবাই পরাজিত অবস্থায় তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সেদিন চাইলে প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ সুযোগ তাঁর হাতে ছিল। কিন্তু বিজয়ীর হাতে অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁর হৃদয়ে ছিল ক্ষমার সমুদ্র। তিনি প্রতিহিংসার আগুন জ্বালিয়ে দেননি; বরং ক্ষমার দ্বার খুলে দিয়েছিলেন।

এমন বিজয় পৃথিবীর ইতিহাসে সত্যিই বিরল, যেখানে বিজয়ী প্রতিশোধের আনন্দে নয়, ক্ষমার মহিমায় মহিমান্বিত হন।

পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন অনন্য আদর্শ। স্ত্রীদের সঙ্গে কোমল আচরণ, সন্তানদের প্রতি স্নেহ, ছোটদের প্রতি মমতা এবং বড়দের প্রতি সম্মান—সব মিলিয়ে তাঁর ঘর ছিল মানবিকতার এক উজ্জ্বল বিদ্যালয়। তিনি নিজ হাতে নিজের কাজ করতেন, নিজের কাপড় সেলাই করতেন, পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। এত বড় একজন নেতা হয়েও তাঁর জীবন ছিল অহংকারমুক্ত, সরল ও বিনয়ী।

তিনি ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক, সেনাপতি, শিক্ষক, বিচারক, স্বামী, পিতা, বন্ধু ও পথপ্রদর্শক। কিন্তু প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন পূর্ণতার অনন্য উদাহরণ।

আজকের পৃথিবী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আকাশ ছুঁয়েছে। মানুষের হাতে হাতে তার অবাধ ব্যবহার, মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার সক্ষমতা এসেছে, যোগাযোগের গতি বেড়েছে বহুগুণ। অথচ মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব যেন অনেক বেড়ে গেছে। হিংসা, অহংকার, বিদ্বেষ, প্রতারণা, বৈষম্য ও অশান্তি আজও মানুষের জীবনকে গ্রাস করছে। এমন সময়ে মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন আমাদের কাছে কেবল অতীতের কোনো ইতিহাস নয়; বরং বর্তমানের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পথনির্দেশ।

তিনি আমাদের শেখান, ক্ষমতা পেলে বিনয়ী হতে, বিজয় পেলে ক্ষমা করতে, কষ্ট পেলে ধৈর্য ধরতে, অন্যায় দেখলে ন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে, দুর্বলকে অবহেলা না করতে এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে।

মুহাম্মদ (সা.) তাই কেবল একজন ধর্মীয় নেতা নন; তিনি মানবতার জন্য আল্লাহপ্রদত্ত এক অনুপম আদর্শ। তাঁর জীবনের আলো যত বেশি ছড়িয়ে পড়বে, মানুষের হৃদয়ের অন্ধকার তত বেশি দূর হবে।

যুগ পাল্টাবে, সভ্যতাও রূপ বদলাবে, প্রযুক্তি আরও এগিয়ে যাবে। কিন্তু সত্যের প্রয়োজন শেষ হবে না, ন্যায়ের প্রয়োজন শেষ হবে না, ভালোবাসা ও ক্ষমার প্রয়োজন শেষ হবে না। আর যতদিন মানুষের প্রয়োজন থাকবে সত্য, ন্যায়, দয়া ও মানবিকতার, ততদিন মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন থাকবে পৃথিবীর বুকে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে।

তিনি যেন আদর্শের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, যার আলোয় পথ খুঁজে নেয় অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মানুষ। তাঁর জীবন শুধু পড়ার জন্য নয়, অনুসরণের জন্য; শুধু ভালোবাসার জন্য নয়, তাঁর আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করার জন্য।

মুহাম্মদ (সা.) মানবতার হৃদয়ে জ্বলে থাকা সেই অনন্ত আলোর ফোয়ারা, যার আলো কোনো ভোরে নিভে যাওয়ার নয়।

~ মুফতী আশরাফুল হক রাকিব
আলেম, লেখক, গবেষক ও সংগঠক
(ত্রিশাল, ময়মনসিংহ)

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি