জাতিসংঘে শান্তি ও মানবতার পক্ষে বাংলাদেশের বার্তা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিশ্বশান্তি, মানবতা, নিরস্ত্রীকরণ ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাত ৪টা ১৯ মিনিটে তাঁর ভাষণ শুরু হয়।
ভাষণের শুরুতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিদায়ী সভাপতি এনালেনা বেয়ারবককে তাঁর নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন তিনি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণে তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে বাংলাদেশ বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণই তাঁদের সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।
জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে নিজের পারিবারিক স্মৃতিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তাঁর বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া একই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে দেশ ও জনগণের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের ধারাবাহিকতায় তিনিও বাংলাদেশের জনগণ ও দেশের স্বার্থ এবং শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা নিয়ে জাতিসংঘে দাঁড়িয়েছেন।
বৈশ্বিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবীর এক প্রান্তের ঘটনা অন্য প্রান্তের দেশগুলোকেও কমবেশি প্রভাবিত করে। মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে বিভিন্ন দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছে এবং সৃষ্টি হচ্ছে মানবিক সংকট।
তিনি বলেন, যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি শান্তিময় ও মানবিক বিশ্ব চায়, যেখানে মারণাস্ত্র নয়, বরং যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে। একে অপরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
সামরিক ব্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বিশ্বশান্তির পথে অন্তরায়। শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিশ্ব মানবতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোনো উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গও গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।