বিপ্লব সিকদার : বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়া এখন সময়ের দাবি। সেই বাস্তবতায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বা বিপণন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। এটি একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন উৎস তৈরি করবে, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর চাপ কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথও প্রশস্ত করতে পারে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশে সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব আরও বেশি। বছরের বড় একটি সময় পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। ফলে পরিকল্পিতভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় একটি বিকল্প ও তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন উৎস যুক্ত করা সম্ভব।
তবে কোনো ভালো উদ্যোগের সাফল্য শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িত থাকতে হবে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা। সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও এসব প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম প্রশ্ন হলো উৎপাদনের ধারাবাহিকতা। সূর্যের আলো দিনের নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া যায় এবং আবহাওয়ার ওপর সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন অনেকটাই নির্ভরশীল। ফলে গ্রিডে সৌরবিদ্যুতের অংশ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনের ওঠানামা সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হতে পারে কার্যকর এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থা, আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত সমন্বয় করতে সক্ষম ব্যাকআপ বিদ্যুৎ উৎপাদন।
দ্বিতীয়ত, রয়েছে অবকাঠামোর প্রশ্ন। একটি বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করলেই জাতীয় গ্রিড শক্তিশালী হয়ে যায় না। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ নেওয়ার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো। কোথায় কত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, কোথায় গ্রিডের সক্ষমতা কতটুকু, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে—এসব বিষয় আগে থেকেই পরিকল্পনায় থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, ট্রান্সফরমার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা সময়ের সঙ্গে কমতে পারে। নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব কিংবা দক্ষ জনবলের সংকট প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল কমিয়ে দিতে পারে। তাই শুধু প্রকল্প স্থাপন নয়, পুরো জীবনচক্রের ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং গ্রিড-সংযুক্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বৈদ্যুতিক, অগ্নি ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ক্রমেই ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে। ফলে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, তথ্যপ্রবাহ এবং গ্রিড অপারেশনের সাইবার নিরাপত্তা দুর্বল হলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশগত ও ভূমি ব্যবস্থাপনা। সৌরবিদ্যুৎ পরিবেশবান্ধব হলেও বড় প্রকল্পের জন্য বিপুল জমি প্রয়োজন হতে পারে। কৃষিজমি, জলাভূমি বা পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত প্রকল্প হলে একটি ভালো উদ্যোগই নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই পরিত্যক্ত জমি, শিল্পাঞ্চল, ভবনের ছাদ, জলাধারের উপযোগী অংশসহ বিকল্প জায়গা ব্যবহারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
সৌরবিদ্যুতের বাজার ব্যবস্থাপনাও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। উৎপাদক, গ্রিড কর্তৃপক্ষ এবং ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে বিদ্যুৎ ক্রয়মূল্য, সংযোগ ব্যয়, সঞ্চালন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়—সবকিছু স্বচ্ছভাবে নির্ধারণ করা দরকার। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে স্থিতিশীল নীতিমালা ও পূর্বানুমানযোগ্য বাজার কাঠামো প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি সম্ভাবনাময় পথ। কিন্তু এই উদ্যোগকে সফল করতে হলে শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলো, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে বিদ্যুৎটি কতটা নির্ভরযোগ্য, কতটা সাশ্রয়ী, কত বছর কার্যকর থাকবে এবং জাতীয় গ্রিড কতটা নিরাপদে তা গ্রহণ করতে পারছে।
সৌরবিদ্যুৎকে তাই শুধু একটি নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, শক্তিশালী গ্রিড, পর্যাপ্ত স্টোরেজ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
ভালো উদ্যোগকে সফল উদ্যোগে পরিণত করার দায়িত্ব এখন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের। সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বিশাল—তবে সেই সম্ভাবনাকে টেকসই বাস্তবতায় রূপ দিতে হলে উৎপাদনের পাশাপাশি নিরাপত্তা, দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক -সাংবাদিক।