ঢাকা   ১০:৫১:১৪ পিএম, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

থানা হেফাজতে মৃত্যু রাষ্ট্রের ব্যর্থতার নগ্ন দলিল

বিপ্লব সিকদার
  • Update Time : Thursday, December 18, 2025,
  • 756 Time View
  • ৬ মিনিট পড়ার সময়
  • ফন্ট:

 

কুমিল্লার হোমনা থানার ‘নারী ও শিশু সহায়তা ডেস্কে’ এক নারী আসামির মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—থানা হেফাজতে আটক ব্যক্তির জীবন রক্ষায় রাষ্ট্র আদৌ কতটা দায়বদ্ধ। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) ভোরে হামিদা ওরফে ববিতা (৩২) নামের ওই নারী আত্মহত্যা করেছেন বলে পুলিশ দাবি করলেও, ঘটনাটিকে ঘিরে মানবাধিকার, নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তার জীবন ও নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বিশেষ করে থানা হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সূচক হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ বলে দায় শেষ করা হয়, যার ফলে প্রকৃত দায় নির্ধারণের আগেই তদন্ত কার্যত ভোঁতা হয়ে পড়ে।

এই ঘটনায় পুলিশ জানিয়েছে, চার বছরের শিশুসন্তান সঙ্গে থাকায় হামিদাকে হাজতে না রেখে ‘নারী ও শিশু সহায়তা ডেস্কে’ রাখা হয়েছিল এবং সেখানে নারী গ্রাম পুলিশ পাহারায় ছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—যদি পাহারা থেকেই থাকে, তাহলে কীভাবে একজন আটক নারী সবার অগোচরে আত্মহত্যার সুযোগ পান? পাহারার দায়িত্বে থাকা সদস্যরা কোথায় ছিলেন, আর কত সময়ের জন্য নজরদারি শিথিল হয়েছিল—সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।

হেফাজতে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে আত্মহত্যায় ব্যবহৃত হতে পারে—এমন সব উপকরণ সরিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ এ ঘটনায় ওড়না ব্যবহার করে আত্মহত্যার তথ্য সামনে এসেছে, যা সরাসরি নিরাপত্তা প্রটোকল লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়। এটি নিছক অবহেলা, নাকি দায়িত্বহীনতার ফল—সে প্রশ্নের জবাব এখনও অমীমাংসিত।

আরও গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এক নারী—যিনি একটি গুরুতর অপরাধ মামলার আসামি, সামাজিকভাবে নিগৃহীত এবং শিশুসন্তানসহ আটক—তার মানসিক অবস্থার কোনো মূল্যায়ন আদৌ করা হয়েছিল কি না। মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, এমন একজন ব্যক্তিকে আলাদা মনিটরিং ও কাউন্সেলিংয়ের আওতায় রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ মেলেনি।

‘নারী ও শিশু সহায়তা ডেস্ক’ মূলত ভুক্তভোগীদের জন্য তৈরি একটি সুরক্ষিত পরিসর। সেখানে অভিযুক্ত নারীকে দীর্ঘ সময় রাখা নিজেই একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। আইনজ্ঞদের মতে, সহায়তা ডেস্ক কখনোই বিকল্প হাজতখানা হতে পারে না। এই ব্যবস্থাপনা শুধু অনিরাপদই নয়, বরং ভবিষ্যৎ ঝুঁকির দরজাও খুলে দেয়।

পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, থানা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্তের পরিবর্তে পুরো প্রক্রিয়া ‘রুটিন কাজ’ হয়ে দাঁড়ায়।

এই মৃত্যু কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। থানা হেফাজতে কেউ নিরাপদ না হলে, রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

হোমনা থানার এই ঘটনা আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে গেলে তা হবে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ওপর নতুন করে পর্দা টেনে দেওয়ার শামিল। মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হলে নীরবতা নয়, দরকার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
ডেভলপ ও কারিগরী সহায়তায় লোকালহোস্ট আইটি